বুধবার, জুন ২৪, ২০২৬
১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পানিশূন্যতার কারণেও কি নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে?

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুন, ২০২৬, ০২:২৫ পিএম

পানিশূন্যতার কারণেও কি নাক দিয়ে রক্ত পড়তে পারে?
ছবি: সংগৃহীত

দৈনন্দিন জীবনে নাক দিয়ে রক্ত পড়ার সমস্যার সম্মুখীন হননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। সাধারণত এই অপ্রত্যাশিত সমস্যাটির জন্য আমরা শুষ্ক আবহাওয়া, বাতাসে ধুলাবালির আধিক্য, অ্যালার্জির প্রকোপ কিংবা বারবার নাক পরিষ্কার করার প্রবণতাকে দায়ী করে থাকি।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে এপিস্ট্যাক্সিস বলা হয়। তবে এই পরিচিত কারণগুলোর বাইরেও একটি নীরব এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যা সচরাচর আমাদের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। আর সেই উপেক্ষিত কারণটি হলো শরীরে পানিশূন্যতা।

 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, পর্যাপ্ত পানি পান না করার সঙ্গে আমাদের নাকের অভ্যন্তরীণ অবস্থার কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন যে, শরীরে তরলের ঘাটতি নাক দিয়ে রক্ত পড়ার অন্যতম প্রধান একটি কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

 

পানিশূন্যতা কীভাবে নাকের ক্ষতি করে এবং রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তা বুঝতে হলে নাকের অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। আমাদের নাকের ভেতরের অংশে একটি অত্যন্ত পাতলা এবং সংবেদনশীল আস্তরণ বা মিউকাস মেমব্রেন রয়েছে।

 

এই আস্তরণটি অসংখ্য ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম রক্তনালিতে পূর্ণ থাকে। এই সংবেদনশীল টিস্যুগুলোর সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার জন্য সেখানে সঠিক মাত্রায় আর্দ্রতা থাকা একান্ত অপরিহার্য। যখন শরীরে পর্যাপ্ত পানির অভাব দেখা দেয়, তখন নাকের ভেতরের এই আস্তরণটি দ্রুত শুকিয়ে যায়।

 

আর্দ্রতা হারানোর ফলে টিস্যুগুলো পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেখানে একধরনের অস্বস্তিকর জ্বালাভাব বা প্রদাহ দেখা দেয়। এমতাবস্থায় সেই ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে ওঠে। তখন সামান্যতম আঘাত, যেমন- একটি সাধারণ হাঁচি দেওয়া, নাক ঝাড়া, কিংবা এমনকি আঙুল দিয়ে হালকা ঘষা লাগলেও এই রক্তনালিগুলো সহজেই ফেটে গিয়ে রক্তপাত শুরু হতে পারে।

 

শরীরে পানিশূন্যতা সৃষ্টির পেছনে বেশ কিছু পারিপার্শ্বিক ও শারীরিক অবস্থা দায়ী থাকে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহের মাসগুলোতে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে পানি বেরিয়ে যায়।

 

এছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে রোদে কিংবা গরম পরিবেশে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করলে, হঠাৎ করে জ্বর, বমি বা ডায়রিয়ার মতো অসুস্থতায় ভুগলে শরীরে তরলের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়।

 

এর পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলে বা শীতকালে ঘর গরম রাখার যন্ত্র ব্যবহার করলে চারপাশের বাতাস অত্যন্ত শুষ্ক হয়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে পানিশূন্যতা ত্বরান্বিত করে।

 

চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা স্ট্যাটপার্লস-এর একটি বিস্তারিত গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষ যখন সারা দিনে যে পরিমাণ তরল গ্রহণ করে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ তরল শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, তখনই মূলত পানিশূন্যতা নামের এই অবস্থার সৃষ্টি হয়।

 

এই সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো সামান্য তৃষ্ণা পাওয়া থেকে শুরু করে চরম পর্যায়ে পৌঁছালে শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার মতো গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে।

 

তাই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পানিশূন্যতা এবং এর ফলে সৃষ্ট শারীরিক জটিলতাগুলো প্রতিরোধ করতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত দুই থেকে তিন লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

 

নাক দিয়ে রক্ত পড়ার এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা থেকে সুরক্ষিত থাকতে হলে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত এবং প্রধানত, সারা দিন ধরে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

 

বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায় কাজ করার সময় অথবা যেকোনো ধরনের অসুস্থতায় ভোগার সময় শরীরকে আর্দ্র রাখার বিষয়ে সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। নাকের ভেতরের অংশ যাতে শুকিয়ে না যায়, সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লবণপানির স্প্রে বা স্যালাইন ন্যাসাল স্প্রে ব্যবহার করা একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।

 

এছাড়া শুষ্কতা রোধ করতে নাকের ভেতরের দেওয়ালে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে রাখা যেতে পারে। যারা দীর্ঘক্ষণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকেন, তারা ঘরের ভেতরের বাতাসে আর্দ্রতার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য আর্দ্রতা রক্ষাকারী যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন, যা নাকের আস্তরণকে শুকিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে।

 

সাধারণত নাক দিয়ে রক্ত পড়ার ঘটনাগুলো খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং প্রাথমিক পরিচর্যাতেই তা দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই সমস্যাটিকে সাধারণ বিষয় হিসেবে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অপরিহার্য।

 

যদি নাকের ওপর চাপ দিয়ে ধরে রাখার পর টানা বিশ মিনিট পেরিয়ে গেলেও রক্তপাত কোনোভাবেই বন্ধ না হয়, তবে তা গভীর উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এছাড়া কোনো দুর্ঘটনায় মাথায় বা মুখে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর নাক দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হলে, রক্তপাতের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি মনে হলে এবং কোনো ধরনের স্পষ্ট কারণ বা আঘাত ছাড়াই যদি এই সমস্যাটি নিয়মিত বিরতিতে বারবার ফিরে আসতে থাকে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের হস্তক্ষেপ বড় ধরনের কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।