উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এক দশকেরও বেশি সময় আগে গণতন্ত্রের সুতিকাগার হিসেবে পরিচিতি লাভ করা এই দেশটিতে বর্তমানে এক দমবন্ধ করা ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
নাগরিক অধিকার রক্ষা, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর এক দফা দাবিতে শনিবার তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসের রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।
এই বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভের মূল ও প্রধান লক্ষ্য ছিল বর্তমান প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের নিঃশর্ত পদত্যাগ দাবি করা। একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন নিয়ে যে দেশের মুক্তিকামী মানুষ একসময় রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিল, আজ তারা নিজেদের সেই হারানো অধিকার পুনরায় ফিরে পাওয়ার জন্য নতুন করে তীব্র সংগ্রাম শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর ক্যামেরায় তিউনিসের রাজপথের এই উত্তাল চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। এই গণবিক্ষোভের নেপথ্যে প্রধান আয়োজক হিসেবে ছিল তিউনিসিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী, ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন ‘ইউজিটিটি’।
তাদের এই যুগান্তকারী আহ্বানে সাড়া দিয়ে কাঁধ মিলিয়ে এই বিশাল প্রতিবাদী আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে দেশের বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো।
শনিবার সকাল থেকেই রাজধানী তিউনিসের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে সাধারণ মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। হাতে বিভিন্ন প্রতিবাদী দাবি-দাওয়া সম্বলিত প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে তারা সুশৃঙ্খল অথচ অত্যন্ত জোরালোভাবে গণমিছিল নিয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজপথ প্রদক্ষিণ করেন।
এ সময় আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে সরকারের স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে দেওয়া নানা ধরনের স্লোগানে। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে বারবার ধ্বনিত হতে থাকে মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার রক্ষার বজ্রকঠিন দাবি।
দেশের এই চরম অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং লাগামহীন রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য তারা সরাসরি প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদকে দায়ী করে অবিলম্বে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে তার পদত্যাগ দাবি করেন। এই বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সমাজের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছিল পিপলস মুভমেন্ট, এন্নাহদা মুভমেন্ট এবং ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্ট। এই দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের অসাংবিধানিক ক্ষমতা দখল, একক আধিপত্য বিস্তার এবং অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার তীব্র ও প্রকাশ্য সমালোচনা করে আসছে।
নিজেদের মধ্যকার রাজনৈতিক মতাদর্শের বিস্তর ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, আজ কেবল দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং লুণ্ঠিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অভিন্ন দাবিতে তারা একই ছাতার নিচে সমবেত হয়েছেন।
তাদের এই ঐক্যবদ্ধ ও বিশাল উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তিউনিসিয়ার বর্তমান সরকার কেবল সাধারণ মানুষের কাছেই নয়, বরং দেশের সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাদের ন্যূনতম গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে।
হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে এই বিশাল গণমিছিলটি যখন শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ঐতিহাসিক মিউনিসিপ্যাল থিয়েটারের সামনে এসে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক বিশাল, স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগঘন সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
এই ঐতিহাসিক সমাবেশে উপস্থিত বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে এক জ্বালাময়ী ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন শ্রমিক সংগঠন ইউজিটিটি-এর সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন সালমি। তিনি তার বলিষ্ঠ বক্তব্যে বর্তমান সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ ও একগুঁয়েমির তীব্র সমালোচনা করেন।
সরকারের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, সরকার যদি বিরোধী রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে অর্থবহ ও গঠনমূলক আলোচনার সমস্ত পথ চিরতরে বন্ধ করে দেয়, তবে দেশের রাজপথ এবং উন্মুক্ত চত্বরগুলোই হবে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের ও প্রতিবাদের একমাত্র মূল মঞ্চ।
তিনি তিউনিসিয়ার মানুষের মৌলিক অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বাকস্বাধীনতা রক্ষায় দেশের সমগ্র আপামর জনসাধারণকে সব ধরনের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
সালাহ উদ্দিন সালমি তার ভাষণে সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, বর্তমান শাসনামলে দেশের প্রতিটি স্তরে মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে। তিউনিসিয়ার মতো একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রকে কোনোভাবেই কেবল একজন মাত্র ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী শাসনে চলতে দেওয়া যায় না।
তিনি উপস্থিত জনতার আবেগ ছুঁয়ে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, এমন একটি স্বৈরাচারী ও সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন সরকারের হাতে মাতৃভূমির ভবিষ্যৎকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছেড়ে দেওয়া যায় না, যারা সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা কানে তোলে না এবং জনগণের ন্যায্য অধিকারকে বুটজুতার তলায় পিষ্ট করে শাসনকার্য পরিচালনা করে।
তার এই তেজস্বী বক্তব্য সমাবেশে উপস্থিত হাজারো জনতার মাঝে নতুন করে প্রবল উন্মাদনা, সাহস ও প্রতিরোধের স্পৃহা সঞ্চার করে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা ও হতাশার চিত্রও ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক।
মিছিলে অংশ নেওয়া মুনির জেলাসি নামের একজন সাধারণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে তার এই সরকারবিরোধী আন্দোলনে সরাসরি যোগ দেওয়ার পেছনের যৌক্তিক কারণগুলো অত্যন্ত বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানান যে, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আজ ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ চাইলেও সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে বা নিজেদের অধিকারের পক্ষে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে না।
প্রতিটি পদক্ষেপে মৌলিক স্বাধীনতার ওপর অত্যন্ত কঠোর ও অগণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে, যা একটি স্বাধীন দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর ও অপমানজনক।
মুনির জেলাসি রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথাও অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট চলছে।
লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম এমন অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক হারে বাড়ছে যে, সাধারণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিকে রাজনৈতিক অধিকার হরণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক মুক্তি থেকে বঞ্চনা-এই দুইয়ের নির্মম যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েই আজ তিউনিসিয়ার আপামর জনতা বাধ্য হয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে।
তিউনিসিয়ার এই চলমান বিক্ষোভ মূলত এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটেরই অনিবার্য পরিণতি। ২০১১ সালের ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্তের’ সূতিকাগার হিসেবে বিশ্বদরবারে পরিচিত এই দেশটি একসময় সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জন্য স্বৈরতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতো।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে যখন থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ দেশের রাষ্ট্রীয় সমস্ত ক্ষমতা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিকভাবে নিজের একক আধিপত্যে কুক্ষিগত করেছেন, ঠিক তখন থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির মারাত্মক ও দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে।
তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ বাতিল করে দিয়েছেন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করেছেন এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়েছেন। অর্থনৈতিক দিক থেকেও তিউনিসিয়া বর্তমানে এক অতল খাদের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে এসে ঠেকেছে, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এর সরাসরি ও নির্মম প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর। রাজধানী তিউনিসসহ দেশের প্রধান শহরগুলোর বাজারগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক পণ্যের তীব্র ও হাহাকারপূর্ণ সংকট দেখা দিয়েছে।
শনিবারের এই বিশাল গণবিক্ষোভ প্রমাণ করেছে যে, তিউনিসিয়ার সাধারণ মানুষ তাদের লুণ্ঠিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে স্বৈরাচারের কাছে কখনোই মাথানত করবে না। আগামী দিনগুলোতে এই আন্দোলন আরও বেগবান হবে বলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যা তিউনিসিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে।