পশ্চিম আফ্রিকায় ক্রমবর্ধমান ফরাসি-বিরোধী মনোভাবের মধ্যে ফ্রান্স বৃহস্পতিবার সকালে সেনেগালের কাছে তাদের শেষ দুটি সামরিক ঘাঁটি ফিরিয়ে দিয়েছে। ডাকারে অনুষ্ঠিত এক আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সেনেগালের জেনারেল এমবায়ে সিসে এবং আফ্রিকায় ফরাসি কমান্ডের প্রধান পাস্কাল ইয়ান্নি উপস্থিত ছিলেন। এর মাধ্যমে সেনেগালে ফ্রান্সের ৬৫ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান হলো।
অনুষ্ঠানে জেনারেল সিসে তার বক্তব্যে বলেন, "এটি আমাদের দুই দেশের সমৃদ্ধ ও দীর্ঘ সামরিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ফরাসি ও সেনেগালের সেনাবাহিনী দুই দেশের মধ্যে "নিরাপত্তা অংশীদারিত্বকে নতুন অর্থ দিতে" "নতুন উদ্দেশ্য নির্ধারণ" করেছে। তিনি উপসংহারে বলেন, "সেনেগালের সশস্ত্র বাহিনী কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে অর্জিত বহু সাফল্যকে সুসংহত করার জন্য উন্মুখ।"
১৯৬৯ সালে সেনেগালের স্বাধীনতার পর থেকে ফরাসি সেনাবাহিনী দেশটিতে একটি স্থায়ী ঘাঁটি বজায় রেখেছিল। ক্যাম্প গিল (Camp Geille), যেখানে প্রায় ৩৫০ ফরাসি সৈন্য মোতায়েন ছিল, সেটিই সেনেগালের কমান্ডের কাছে হস্তান্তরিত হওয়া শেষ ঘাঁটি। গত বছরের মার্চ মাস থেকে বেশ কয়েকটি অন্যান্য সামরিক স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়ার পর এটি বন্ধ হলো।
ফরাসি প্রভাব অবসানের পথে সেনেগালগত ডিসেম্বরে সেনেগালের প্রেসিডেন্ট বাসিরু ডিওমায়ে ফায়ে ঘোষণা করেন যে, তার সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে সেনেগালের মাটি থেকে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি অবসানের জন্য কাজ করবে। এই ঘোষণা সেনেগালে নব্য-ঔপনিবেশিক প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার পরেই আসে, যা ২০২১ সালের গণবিক্ষোভে বেশ কিছু ফরাসি মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় চূড়ান্ত রূপ নেয়।
ফায়ে এএফপিকে বলেন, "সেনেগাল একটি স্বাধীন দেশ, এটি একটি সার্বভৌম দেশ, এবং সার্বভৌমত্ব একটি সার্বভৌম দেশে সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি মেনে নেয় না।"
সেনেগাল এবং এর প্রাক্তন ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের মধ্যে সম্পর্ক বেশ কিছু কেলেঙ্কারির কারণে তিক্ত হয়েছে। ফরাসি বাহিনীর দ্বারা পশ্চিম আফ্রিকার সৈন্যদের গণহত্যার ৮০তম বার্ষিকীতে ফায়ে ফরাসি সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করার ঘোষণা দেন। এই গণহত্যার শিকার হয়েছিলেন তিরেইলুর সেনেগালাইস (Tirailleurs Senegalais) ইউনিটের সদস্যরা, যারা নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের যুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তারা বকেয়া বেতন এবং নিম্নমানের জীবনযাত্রার প্রতিবাদ করার সময় ঔপনিবেশিক সৈন্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করেছিল। এই বছর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রেসিডেন্ট ফায়েকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যেখানে তিনি স্বীকার করেন যে ফ্রান্স একটি "গণহত্যা" সংঘটিত করেছিল।
সেনেগালের সামরিক কার্যক্রমের এই সমাপ্তি পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের জন্য সর্বশেষ কূটনৈতিক ধাক্কা। কারণ এই অঞ্চলে ফ্রান্স-বিরোধী সরকারগুলো ক্ষমতায় এসেছে। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের প্রাক্তন উপনিবেশ বুরকিনা ফাসো, নাইজার এবং মালিতে সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে ৪,৩০০ ফরাসি সৈন্যকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই দেশগুলোর সামরিক নেতারা ফ্রান্সের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়া সহ নতুন মিত্রদের দিকে ঝুঁকেছে।
২০২২ সালে ফ্রান্স সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং এই বছরের শুরুর দিকে আইভরি কোস্ট ও চাদের তাদের শেষ ঘাঁটিগুলো হস্তান্তর করে। জিবুতিতে অবস্থিত ঘাঁটিটিই এখন আফ্রিকায় ফ্রান্সের একমাত্র স্থায়ী সামরিক মিশন, যেখানে প্রায় ১,৫০০ সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।