অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিশদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, গত ২৮ এপ্রিলের ওই বিমান হামলায় আফ্রিকান অভিবাসীদের জন্য ব্যবহৃত একটি আটক কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এই বন্দিশিবিরটি এমন অভিবাসীদের আবাসস্থল ছিল, যারা সংঘাতপূর্ণ ইয়েমেন হয়ে সৌদি আরবে কাজের সন্ধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিলেন। নিহতদের অধিকাংশই ইথিওপীয় নাগরিক ছিলেন বলে জানা গেছে।
সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে যে, এই আক্রমণ ছিল নির্বিচার এবং এটি ইয়েমেনের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে জড়িত সকল পক্ষের দ্বারা চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক স্পষ্ট উদাহরণ। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক আইন বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক উপ-পরিচালক ক্রিস্টিন বেকারলে এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, "সাদায় অভিবাসী আটক কেন্দ্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলাটি নির্বিচার আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এটিকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে তদন্ত করা উচিত।" তাঁর এই কঠোর মন্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে তাৎক্ষণিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বেকারলে আরও উল্লেখ করেন যে, এই ঘটনার জন্য কেবল হামলাকারী পক্ষই নয়, আটক কেন্দ্রের হুতি রক্ষীরাও দায়বদ্ধ। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন বিমান হামলার ঠিক মুহূর্তখানেক আগে কাছাকাছি এলাকায় আরেকটি বিমান হামলা হওয়ার পর বন্দীরা আতঙ্কে মুক্তি চেয়েছিল। কিন্তু মানবিক সহায়তার পরিবর্তে, হুতি রক্ষীরা তাদের কথা না শুনে উল্টো সতর্কতামূলক গুলি চালায়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্দিশিবিরটি ভয়াবহ আঘাতের শিকার হয়। হুতিদের এই আচরণ বন্দীদের জীবন বিপন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করে অ্যামনেস্টি।
এই মর্মান্তিক হামলার পরেও মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেনি। এটি এমন একটি স্থান, যা পূর্বেও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘকাল ধরে, এই আটক কেন্দ্রটি হুতিদের দ্বারা কঠোর পরিস্থিতিতে আটকে রাখা অভিবাসীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, সামরিক অভিযান পরিচালনার সময় বেসামরিক স্থাপনা এবং বিশেষ করে বন্দিশিবিরের মতো সংবেদনশীল স্থানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। এই ক্ষেত্রে সেই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ক্রিস্টিন বেকারলে নিহত ও আহত অভিবাসীদের মানবিক দিকটি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "এই মানুষগুলোর অনেকে ইথিওপিয়া ছেড়েছিলেন শুধু তাদের পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কাজ খুঁজতেই। আর এখন, তাদের পরিবারগুলোই আঘাত থেকে আরোগ্য লাভে সহায়তা করার জন্য ইয়েমেনে টাকা পাঠাচ্ছে।" এই মন্তব্যটি সংঘাতের শিকার সাধারণ মানুষের উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে তুলে ধরে।
জানা গেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলা সম্প্রতি ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামের সামরিক অভিযানের অধীনে তীব্রতা লাভ করেছে। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল হুতি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা। এই অভিযানের আওতায় ইয়েমেনে ১,০০০-এরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বর্ধিত সামরিক কার্যকলাপের কারণেই বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা জরুরি, যা এই ঘটনায় লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অ্যামনেস্টি মনে করছে।
এই ঘটনাটি ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটে পরিণত করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যুদ্ধাপরাধের তদন্তের দাবি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের পথ প্রশস্ত করতে পারে। বিশ্বজুড়ে থাকা মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে। এছাড়া হুতি রক্ষীদের ভূমিকারও উপযুক্ত আইনি যাচাই-বাছাই হওয়া প্রয়োজন।
এই সংবেদনশীল ঘটনাটি ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক বিপর্যয় এবং তৃতীয় পক্ষের সামরিক হস্তক্ষেপের জেরে বেসামরিক নাগরিকদের অকথ্য দুর্ভোগের করুণ চিত্র আবারও তুলে ধরল। এই পরিস্থিতির একটি নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।