দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পর যারা ধ্বংসস্তূপের মাঝে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসছেন, তারা এখন এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি, যা লাখো মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সুদানের সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যকার এই সংঘাতে দেশটির অর্থনীতি, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
ওমদুরমান শিল্প এলাকার কারখানা মালিক মামুন গিলির বক্তব্যে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ চিত্র। তিনি জানান, যুদ্ধের সময় আরএসএফ মিলিশিয়ারা অনেক কারখানায় অগ্নিসংযোগ করে, যার ফলে সংরক্ষিত বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। মেরামতের সুযোগ না থাকায় এবং কর্তৃপক্ষের অভাবে সেই বিষাক্ত উপাদানগুলো এখন লিকেজের মাধ্যমে জনবসতির বাতাসে মিশে যাচ্ছে, যা স্থানীয়দের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খার্তুমের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ তাহা বেদাওয়ি জানান, দীর্ঘ দুই বছর ধরে রাজধানী ও এর গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো মিলিশিয়াদের দখলে ছিল। এই সময়ে হাসপাতালগুলো কার্যত মহামারীর প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়। চিকিৎসাকর্মীদের হত্যা এবং অ্যাম্বুলেন্স লুটপাটের কারণে মহামারী বা রোগবালাই প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এছাড়া, বিস্ফোরক হামলায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হাজার হাজার ভবন থেকে অ্যাসবেস্টসের মতো ক্ষতিকর পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে, যা মানুষের ফুসফুসে ঢুকে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত জটিল রোগ সৃষ্টি করছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায়, সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এই বিষাক্ত ধূলিকণার মধ্যেই বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে।
শহরের পানি শোধন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা যুদ্ধের ডামাডোলে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ময়লা-আবর্জনা উন্মুক্ত স্থানে জমা হচ্ছে এবং তা গড়িয়ে সরাসরি নীল নদে গিয়ে মিশছে। এর ফলে সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য এই দূষণ এখন নিত্যদিনের সঙ্গী।
ইনসাফ মোহাম্মদ নামের এক ভুক্তভোগী নারী জানান, ঘরে ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি ডেঙ্গু ও টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছেন এবং দূষণের কারণে তার পরিবারের প্রায় সবাই এখন অসুস্থ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সুদানের এই পরিবেশগত ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে কয়েক বছর নয়, বরং কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে।
ম্যালেরিয়া, কলেরা এবং টাইফয়েডের মতো রোগের বিস্তার রোধে এখনই আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটিকে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়ের মোকাবেলা করতে হবে।