শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঔপনিবেশিক অপরাধের স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে আলজিয়ার্সে আফ্রিকান নেতাদের ঐতিহাসিক ডাক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:৪৪ পিএম

ঔপনিবেশিক অপরাধের স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণের দাবিতে আলজিয়ার্সে আফ্রিকান নেতাদের ঐতিহাসিক ডাক
ছবি: AP

আফ্রিকা মহাদেশের ওপর ঔপনিবেশিক শাসনামলে সংঘটিত অমানবিক অপরাধগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবিতে আলজিয়ার্সে একত্রিত হয়েছেন আফ্রিকান নেতারা। রবিবার অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে নেতারা ঔপনিবেশিক শোষণকে আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) তত্ত্বাবধানে একটি কার্যকর ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া চালুর জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

 

এর আগে গত মে মাসে অনুষ্ঠিত একটি শীর্ষ সম্মেলনে পাস করা প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই এই দাবি নতুন করে উত্থাপন করা হয়েছে, যেখানে উপনিবেশবাদকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনে এই প্রথাটি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না থাকায়, নেতারা এর আইনি কাঠামোর পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

 

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা আফ্রিকা মহাদেশের ওপর ঔপনিবেশিক শাসনের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। ইউরোপীয় শক্তিগুলো কীভাবে সোনা, হীরা এবং রাবারের মতো মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করে আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে চরম দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তা বিশদভাবে আলোচিত হয়। এই লুণ্ঠনের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, ধারণা করা হয় যে এর পরিমাণ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

 

আলজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আত্তাফ বলেন, ফরাসি শাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তার দেশে এই সম্মেলন আয়োজন করা অত্যন্ত প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একটি আইনি কাঠামো নিশ্চিত করবে যে ক্ষতিপূরণ প্রদান কোনো ‘উপহার বা অনুগ্রহ’ নয়, বরং এটি শোষিত জাতির একটি ন্যায্য অধিকার। আলজেরিয়ার ইতিহাস ঔপনিবেশিকতার এক নির্মম সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

সেখানে প্রায় দশ লাখ ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারী আলজেরীয়দের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করত, যদিও আইনত আলজেরিয়া ছিল ফ্রান্সের অংশ। দেশটির রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় লাখ লাখ আলজেরীয় প্রাণ হারান। ফরাসি বাহিনী তখন বিদ্রোহ দমনের নামে সাধারণ মানুষকে গুম, নির্যাতন এবং গ্রামগুলো ধ্বংস করার মতো জঘন্য কৌশল অবলম্বন করেছিল।

 

আত্তাফ উল্লেখ করেন যে, আলজেরিয়ার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত, যার নির্মমতা ও ব্যাপকতা অতুলনীয়। ২০১৭ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফরাসি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কিছু অংশকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করলেও, তিনি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা থেকে বিরত ছিলেন এবং অতীতের অবিচার নিয়ে খুব বেশি আক্ষেপ না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

 

তবে আফ্রিকান নেতারা এখন কেবল মৌখিক স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। ক্ষতিপূরণের এই দাবির সাথে ইউরোপীয় জাদুঘরগুলো থেকে লুণ্ঠিত আফ্রিকান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ফিরিয়ে আনার আন্দোলনও নিবিড়ভাবে জড়িত। আলজেরিয়ার বিখ্যাত ১৬শ শতাব্দীর ‘বাবা মেরজুগ’ কামানের মতো অসংখ্য অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনো ফ্রান্সের দখলে রয়ে গেছে, যা ফিরিয়ে আনার জন্য জোর দাবি জানানো হচ্ছে। এই সম্মেলনটি আফ্রিকান দেশগুলোর নিজেদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

 

- Africa News