জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুদানের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বর্তমানে দেশটির ২ কোটিরও বেশি মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন এবং প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বে একক কোনো দেশে সর্বোচ্চ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা। এর মধ্যে ৪৩ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে, যা ওই অঞ্চলের দেশগুলোর ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।
ওসিএইচএ-এর মুখপাত্র জেনস লার্ক জেনেভায় সাংবাদিকদের জানান, পশ্চিম কর্ডোফানসহ একাধিক ফ্রন্টে এখনো তুমুল লড়াই চলছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কর্ডোফান রাজ্যের রাজধানী কাদুগলি এবং উত্তরের ডিলিং শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে সেখানে খাদ্য, চিকিৎসাসেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। দারফুরেও পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক; সেখানে স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি আকাশপথে ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও বেসামরিক অবকাঠামোগুলোতে দূরপাল্লার হামলার খবর পাওয়া গেছে।
সুদানের সেনাবাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে চলমান এই সংঘাতে শিশুদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের মতে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে সংঘাত শুরুর পর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫,০০০ শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস বলেন, "অনেক শিশু একবার নয়, বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যেখানেই তারা পালিয়েছে, সহিংসতা তাদের পিছু ছাড়েনি।"
তিনি আরও সতর্ক করেন যে, লাখ লাখ শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি ভীত, ক্ষুধার্ত ও অসুস্থ শিশুর মুখ, যারা ভাবছে কেন বিশ্ব তাদের বাঁচাতে এগিয়ে আসছে না। নারীদের অবস্থাও অবর্ণনীয়। ওসিএইচএ জানিয়েছে, প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ, যার অধিকাংশই নারী ও শিশু, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
নারী-প্রধান পরিবারগুলো পুরুষ-প্রধান পরিবারের তুলনায় তিনগুণ বেশি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। লার্ক জানান, তহবিলের অভাবে জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। গত বছর ৪২০ কোটি ডলার চাহিদার বিপরীতে দাতারা মাত্র ৩৬ শতাংশ অর্থায়ন করেছে। ফলে সুদানের প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন থাকলেও ওসিএইচএ মাত্র ২ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করতে পারছে, যার জন্য প্রয়োজন ২৯০ কোটি ডলার।
এই মানবিক বিপর্যয়ের মুহূর্তে জাতিসংঘ অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ এবং স্থায়ী শান্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং ত্রাণকর্মী ও বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।