প্রতিবেদন অনুসারে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট "উত্তেজনা"কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে রাডার সিস্টেম, দূরপাল্লার ড্রোন, জিপিএস জ্যামার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমান মেরামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি চেয়েছেন। এই পদক্ষেপটি ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটিকে ঘিরে একটি ভয়াবহ সামরিক অচলাবস্থার চিত্র তুলে ধরেছে, যা আঞ্চলিক যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে, ভেনেজুয়েলার নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো তাদের সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় ("স্টেট ওয়ান অ্যালার্ট লেভেল") রেখেছে এবং সকল সেনাসদস্যের ছুটি বাতিল করেছে।
এই সামরিক সহায়তার আবেদন এমন এক সময়ে করা হলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একযোগে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে একজন "ম্যাক্রো-টেরোরিস্ট" বা মহন্ত্রাসবাদী কার্টেল নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করেছে, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। এমনকি, ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে গ্রেপ্তারে সহায়তাকারী তথ্যের জন্য ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।
এই অভিযোগকে সামনে রেখেই ওয়াশিংটন পশ্চিম ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে একটি বিশাল নৌ-armada বা নৌবহর মোতায়েন করেছে, যাকে সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম মার্কিন সামরিক সমাবেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বহরে অন্তত আটটি যুদ্ধজাহাজ, পুয়ের্তো রিকোয় এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান এবং একটি বিমানবাহী রণতরীও রয়েছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, এটি একটি "মাদকবিরোধী অভিযান"। এই অভিযানের অংশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভেনেজুয়েলা থেকে ছেড়ে আসা এক ডজনেরও বেশি সন্দেহভাজন কার্টেল জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, মার্কিন বাহিনীর এই হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬১ থেকে ৬২ জন নিহত হয়েছেন।
তবে, প্রেসিডেন্ট মাদুরো এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি পাল্টা অভিযোগ করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি "নতুন যুদ্ধ তৈরি করার পাঁয়তারা" করছেন। মাদুরোর সরকারের দাবি, "মাদকবিরোধী যুদ্ধ" একটি অজুহাত মাত্র; ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল ও গ্যাস সম্পদ "লুট করা"। এই উত্তেজনার মধ্যেই, মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজকে আতিথ্য দেওয়ায় ভেনেজুয়েলা সম্প্রতি ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাস চুক্তি স্থগিত করেছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও মার্কিন এই পদক্ষেপে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক মার্কিন এই হামলাকে "অগ্রহণযোগ্য" এবং "বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড" হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন। 'দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট'-এর ফাঁস করা নথি অনুযায়ী, এই সরাসরি সামরিক হুমকির মুখেই প্রেসিডেন্ট মাদুরো তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দুর্বলতাগুলো ঢাকতে তিনটি প্রধান মিত্র দেশের দ্বারস্থ হয়েছেন।
১. চীনের কাছে আবেদন: প্রেসিডেন্ট মাদুরো সরাসরি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৃষ্ট "উত্তেজনা"র কথা উল্লেখ করে জরুরি ভিত্তিতে "রাডার ডিটেক্টর" বা রাডার শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চেয়েছেন। একই সাথে তিনি দুই দেশের মধ্যে "সম্প্রসারিত সামরিক সহযোগিতা" কামনা করেন। এই আবেদন স্পষ্টতই ক্যারিবিয়ানে মার্কিন নৌবহরের গতিবিধি নিরীক্ষণের লক্ষ্যেই করা হয়েছে।
২. ইরানের কাছে বিশেষায়িত প্রযুক্তি: ইরান, যার ওপর নিজেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে, ভেনেজুয়েলার জন্য অপ্রতিসম যুদ্ধের (asymmetric warfare) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠেছে। কারাকাস তেহরানের কাছে "প্যাসিভ ডিটেকশন ইকুইপমেন্ট" (যা শত্রুর অবস্থান নীরবে শনাক্ত করতে পারে), "জিপিএস স্ক্র্যাম্বলার" (মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের জিপিএস সিস্টেম জ্যাম বা বাধাগ্রস্ত করার প্রযুক্তি) এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ১,০০০ কিলোমিটার (প্রায় ৬০০ মাইল) পাল্লার আক্রমণাত্মক ড্রোন সরবরাহের জন্য অনুরোধ করেছে।
৩. রাশিয়ার কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান সচল করার আর্জি: ভেনেজুয়েলার প্রধান সামরিক মিত্র রাশিয়ার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবেদনটি করা হয়েছে। দেশটির পরিবহন মন্ত্রী রামন সেলেস্তিনো ভেলাসকেজ গত মাসে মস্কো সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি চিঠি বহন করেন। সেই চিঠিতে অনির্দিষ্ট ধরনের "ক্ষেপণাস্ত্র" চাওয়া হয়েছে। তবে তার চেয়েও জরুরি আবেদন ছিল ভেনেজুয়েলার বিমান বাহিনীর প্রধান শক্তি, রাশিয়ার তৈরি সুখোই এসইউ-৩০এমকে২ (Su-30MK2) যুদ্ধবিমান এবং পূর্বে কেনা রাডার সিস্টেমগুলো মেরামতের জন্য জরুরি সহায়তা। এই আবেদন প্রমাণ করে যে, মাদুরো একটি সম্ভাব্য সংঘাতের মুখে তার সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক সরঞ্জামগুলো অবিলম্বে যুদ্ধ-প্রস্তুত করতে চাইছেন।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া, চীন বা ইরান এই অনুরোধগুলোতে ঠিক কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। যদিও মিত্রদের প্রতিক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি, মস্কোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো কারাকাসের প্রতি তাদের অটুট সমর্থনেরই ইঙ্গিত দেয়। মাত্র এই সোমবারই রাশিয়া ভেনেজুয়েলার সাথে ২০১৫ সালের মে মাসে স্বাক্ষরিত একটি "কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি" আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন (ratify) করেছে। এই চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে গভীর সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এই সপ্তাহে খোলাখুলিভাবেই বলেছেন, মস্কো "ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পূর্ণ সমর্থন করে" এবং কারাকাসকে "যেকোনো হুমকি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে, তা যেখান থেকেই আসুক না কেন।" রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভও ক্যারিবিয়ানে মার্কিন সামরিক কর্মকাণ্ডে "গুরুতর উদ্বেগ" প্রকাশ করেছেন।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলা এখন কার্যকরভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া-চীন-ইরান অক্ষের মধ্যে একটি ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। মাদুরো তার চিঠিতে চীনকে দেওয়া বার্তায় এই আদর্শিক বিভাজনকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে মার্কিন এই পদক্ষেপ কেবল তার দেশের বিরুদ্ধেই নয়, বরং এটি "চীনের মতো অভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী" সকল দেশের বিরুদ্ধেই একটি আক্রমণ।
একদিকে যখন মার্কিন নৌবহর ভেনেজুয়েলার উপকূলে টহল দিচ্ছে এবং সামরিক অভিযানের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন যে ভেনেজুয়েলায় সরাসরি হামলার কোনো পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। এই পরস্পরবিরোধী বার্তা সত্ত্বেও, কারাকাস কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর এই জরুরি সামরিক সহায়তার আবেদন প্রমাণ করে, ভেনেজুয়েলা একটি সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তার মিত্ররাও এই সংঘাতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে শুরু করেছে। ক্যারিবিয়ান সাগরে সৃষ্ট এই উত্তেজনা যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।