বঞ্চনা, চিকিৎসকদের হতাশাজনক পূর্বাভাস এবং বিচারিক স্বাধীনতার প্রতি এক অটুট প্রত্যয়-এই সব মিলিয়ে তার জীবনকাহিনী তার দপ্তরে আসা মামলাগুলোর মতোই অসাধারণ ও অনুপ্রেরণামূলক। হফম্যানের জন্ম হয়েছিল এক জটিল প্রক্রিয়ায়, জন্মের সময় তার গলায় নাভি পেঁচিয়ে গিয়েছিল। এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ: তার সম্পূর্ণ শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা তার বেঁচে থাকা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তার শৈশব কেটেছে একাকিত্ব, বঞ্চনা আর অসম্ভব সব বাধার এক ধূসর অধ্যায়ে।
একটি হাত নাড়ানো, পেন্সিল ধরা বা একটি বাক্য উচ্চারণ করা-প্রতিটি কাজই তার জন্য ছিল এক অসাধ্য সাধন। হফম্যান এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, "আমার জন্ম হয়েছিল মাথা থেকে পা পর্যন্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায়।" তার মা-যাকে তিনি 'আমার প্রথম রক্ষক' বলে অভিহিত করেন-এই নির্মম পরিণতি মেনে নিতে অস্বীকার করেন। শিশুকালেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি এক বছর নিবিড় পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন। সেখানে তিনি শরীরের নিষ্ক্রিয় পেশীগুলোকে সক্রিয় করতে এবং সামান্য নড়াচড়া করতে সক্ষম হন।
কিন্তু কলম্বিয়ায় ফেরার পর, এবং স্কুলে ভর্তি হলেও, দুর্ভাগ্যক্রমে তার মায়ের অসুস্থতা তাকে আবার শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে গৃহবন্দী হতে বাধ্য করে। তিনি স্মরণ করেন, "আমি বাড়িতে ধার করা বই আর নীরবতার মাঝে দিন কাটাতাম।" তবে জ্ঞানের প্রতি তার অদম্য কৌতূহল থেমে থাকেনি। এক দিন লুইস অ্যাঞ্জেল আরাঙ্গো গ্রন্থাগারে এক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক এই কৌতূহলী কিশোরকে লক্ষ করেন এবং তাকে ইতিহাস, দর্শন ও অর্থনীতির ওপর সাপ্তাহিক পাঠদান শুরু করেন। সেই সহায়তার হাতই তার শেখার আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে প্রজ্বলিত করে।
তার জীবনের পথচলার প্রতিটি ধাপই এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়। তিনি প্রথমবার নিজের পায়ে হাঁটতে শেখেন ১৪ বছর বয়সে; একই বয়সে তিনি ছুরি ও কাঁটাচামচ ব্যবহার করতে শেখেন এবং ১৬ বছর বয়সে নিজে নিজে পোশাক পরতে সক্ষম হন। দাঁতের মধ্যে পেন্সিল রেখে জিহ্বা ও গলবিলের নিরন্তর ব্যায়ামের মাধ্যমে তিনি তার বাকশক্তি আয়ত্ত করেন।
আইনশাস্ত্রে পড়াটা ছিল পরিবারের সিদ্ধান্ত, কিন্তু আজ তিনি স্বীকার করেন যে এই সিদ্ধান্তই তার সামনে এক নতুন পথ খুলে দিয়েছিল। তিনি বলেন, "আইন হলো মানুষেরই তৈরি একটি কাঠামো, এবং এটি বুঝতে হলে মানুষকেও বুঝতে হয়।" তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও প্রতিকূলতায় ভরা ছিল। যখন তার সহপাঠীরা অনায়াসে সিঁড়ি বেয়ে বা করিডোর পার হতেন, তাকে তখন প্রতিটি পদক্ষেপে সংগ্রাম করতে হতো।
স্নাতক হওয়ার পর কেউ একজন তাকে বলেছিলেন যে, তার জীবনের সর্বোচ্চ গন্তব্য হতে পারে আদালতের একজন করণিক হওয়া। তিনি সে কথায় কান দেননি। কোনো ভালো পোশাক ছাড়াই, যা ছিল তা-ই মেরামত করে তিনি একেবারে নিম্নস্তর থেকে কাজ শুরু করেন এবং অবশেষে বিচারক হন। আজ ৩৫ বছর বয়সে, হফম্যান বোগোতার ৩৭তম মিউনিসিপ্যাল ক্রিমিনাল কোর্টের বিচারকের আসনে আসীন। সাবেক আইনপ্রণেতা মিগুয়েল উরিবের ওপর হামলাকারীর (যিনি 'এল কোস্তেনিয়ো' নামে পরিচিত) শুনানিতে তার নেওয়া কিছু পদক্ষেপ জনসমালোচনার জন্ম দেয়।
কিন্তু হফম্যান তার বিচারিক স্বাধীনতা নিয়ে আপসহীন। তিনি স্পষ্ট করেন, "আমি কখনোই রাষ্ট্রকে দায়ী ঘোষণা করিনি।" তবে তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার তদারকিকারীদের ওপর আক্রমণের বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, "গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই নয়: এটি সংখ্যালঘুদের প্রতি সম্মানও বটে। পরিবর্তন অবশ্যই সামাজিক ঐকমত্যের ফসল হতে হবে, কোনো সরকারের চাপিয়ে দেওয়া নয়।"
এই সপ্তাহেই তিনি হুয়ান এস্তেবান মোরেনো হত্যাকাণ্ডের শুনানি পরিচালনা করছিলেন। শুক্রবার বিকেলে শুনানির বিরতিতে তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে আহত হন এবং তাকে সান্তা ফে ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নেওয়া হয়। যে বিচারক নিজের ভাগ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তিনি এখন ন্যায়বিচারের সন্ধান করছেন অন্যের মামলায়।