শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা, অভিযুক্তের মানসিক প্রতিবন্ধকতা ও আদালতের চাঞ্চল্যকর তথ্য

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর, ২০২৫, ০৪:২১ পিএম

অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থী হত্যা, অভিযুক্তের মানসিক প্রতিবন্ধকতা ও আদালতের চাঞ্চল্যকর তথ্য
ছবি: ABC News

অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মো. ইশফাকুর রহমানকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠে এসেছে নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। নর্দার্ন টেরিটরি সুপ্রিম কোর্টে চলমান শুনানিতে জানানো হয়েছে যে, অভিযুক্ত ব্রেন্ডন ক্যান্টিলা সম্ভবত ‘বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা’ বা ইন্টেলেকচুয়াল ডিজএবিলিটিতে ভুগছেন, যা তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করেছিল।

 

২৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ ইশফাকুর রহমানকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ক্যান্টিলা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতে এই মানসিক অক্ষমতার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। ২০২৩ সালের মে মাসে ডারউইনের উত্তরাঞ্চলীয় শহরতলিতে ইশফাকুর রহমানের ভাড়া বাসায় গভীর রাতে এই নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর মাত্র তিন মাসের মাথায় মর্মান্তিক এই পরিণতির শিকার হন ইশফাকুর।

 

আদালতের নথিপত্র এবং উভয় পক্ষের আইনজীবীদের সম্মতি অনুযায়ী জানা যায়, ঘটনার রাতে ইশফাকুর যখন ঘুমাচ্ছিলেন, তখন ক্যান্টিলা তার ঘরে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি প্রথমে একটি ভারী ইট দিয়ে ইশফাকুরের মাথায় আঘাত করেন। আঘাতের পর ইশফাকুর যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন, তখন ক্যান্টিলা একটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার দিয়ে তাকে পুনরায় আঘাত করেন। এই হামলায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ওই শিক্ষার্থী।

 

বুধবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন নিউরোসাইকোলজিস্ট লরা স্কট, যিনি ২০২৪ সালে কারাগারে আটক থাকাকালে অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। লরা স্কট আদালতকে জানান, ঘটনার সময় ২৯ বছর বয়সী ক্যান্টিলার মানসিক গঠন বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ছিল একজন নয় বছর বয়সী শিশুর সমতুল্য। তার আইকিউ পরীক্ষার ফলাফলও মৃদু মানসিক প্রতিবন্ধকতার ইঙ্গিত দেয়।

 

যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চূড়ান্ত রোগনির্ণয় বা ডায়াগনসিস দিতে পারেননি, তবে তিনি মত দেন যে, অভিযুক্তের মানসিক প্রতিবন্ধকতা থাকার সম্ভাবনা প্রবল। মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অভিযুক্তের জবানবন্দির কিছু অংশও। লরা স্কট জানান, ক্যান্টিলা তাকে বলেছিলেন যে ঘটনার আগে তিনি দুই ব্যক্তির সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ইশফাকুর রহমানও ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।

 

ক্যান্টিলার দাবি অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা তার মৃত মাকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য এবং বর্ণবাদী গালিগালাজ করেছিলেন। এতে তিনি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। তবে সাইকোলজিস্টের কাছে ক্যান্টিলা দাবি করেছেন, তিনি ইশফাকুরকে হত্যা করতে চাননি, কেবল গুরুতরভাবে আহত করে হাসপাতালে পাঠাতে চেয়েছিলেন।

 

আদালতে প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী লয়েড বাব এসসি যুক্তি দেখান যে, ক্যান্টিলার কর্মকাণ্ডে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ছাপ ছিল। সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না তা পরীক্ষা করা এবং পরবর্তীতে পুলিশের কাছ থেকে আলামত হিসেবে ব্যবহৃত ইটটি লুকানোর চেষ্টা করা-এ সবই প্রমাণ করে যে তিনি সজ্ঞানে অপরাধটি সংঘটিন করেছেন। তবে নিউরোসাইকোলজিস্ট স্কট পাল্টা যুক্তি দেন যে, হামলাটি ইচ্ছাকৃত হলেও তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ছিল না।

 

তিনি বলেন, ক্যান্টিলার মতো মানসিক অবস্থার একজন ব্যক্তির পক্ষে প্ররোচনায় নিজেকে সংবরণ করা বা অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা অত্যন্ত কঠিন। এমনকি পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্তের হাসি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তার পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবনে অক্ষমতাকেই নির্দেশ করে বলে মত দেন তিনি।

 

বিচারিক কার্যক্রমের এই পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বাস্তবতা, অন্যদিকে অভিযুক্তের মানসিক অক্ষমতার দাবি-এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বৃহস্পতিবারও এই মামলার শুনানি অব্যাহত থাকবে।

 

- ABC News