রবিবার, জুন ৭, ২০২৬
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন দেশের নাগরিকদের কাজের ভিসা প্রদান বন্ধ করল হাঙ্গেরি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

তিন দেশের নাগরিকদের কাজের ভিসা প্রদান বন্ধ করল হাঙ্গেরি
ছবি : Collected

ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হাঙ্গেরি তাদের শ্রমবাজার ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সুরক্ষার লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিদেশি শ্রমিকদের অবাধ প্রবেশাধিকার সীমিত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফিলিপাইন, জর্জিয়া এবং আর্মেনিয়ার নাগরিকদের জন্য নতুন করে সব ধরনের কর্মসংস্থান বা কাজের ভিসা প্রদান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার।

 

হাঙ্গেরি সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী ১২ জুন শুক্রবার থেকে এই কঠোর আইনি সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে।

 

মূলত দেশে বিদেশি শ্রমিকের ক্রমাগত প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করার প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।

 

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে এই সিদ্ধান্তের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচনে হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানকে পরাজিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন নতুন নেতা পিটার মাজিয়ার।

 

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মাজিয়ারের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল টিসজা পার্টির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের আওতাভুক্ত নয়, এমন দেশগুলো থেকে আসা সস্তা বিদেশি শ্রমিকদের ভিসা প্রদান প্রক্রিয়া দ্রুত বন্ধ করা।

 

নির্বাচনী সেই প্রতিশ্রুতিরই ধারাবাহিক ও বাস্তবসম্মত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নতুন সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেই এই দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের এই নীতির যৌক্তিকতা তুলে ধরে সরকারি মুখপাত্র ভানদা জনদি একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

 

তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, স্বল্প বেতনের বিদেশি শ্রমিকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে স্থানীয় হাঙ্গেরীয় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

 

দেশের সাধারণ নাগরিকদের কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতেই সরকার বিদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ ধীরে ধীরে আরও সীমিত করার এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

 

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে হাঙ্গেরির মোট শ্রমশক্তির মাত্র দুই শতাংশ বিদেশি শ্রমিক দ্বারা পূর্ণ। তা সত্ত্বেও, দেশটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত এবং ভারী উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানাগুলো তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে এই বিদেশি শ্রমিকদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

 

আইনি কাঠামোর বিষয়ে জানানো হয়েছে, সরকারের নতুন এই নির্দেশনার ফলে জনবল সরবরাহকারী বা রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ফিলিপাইন, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া থেকে শ্রমিক নিয়োগের বিদ্যমান সরকারি ডিক্রি সংশোধন করা হবে।

 

এর ফলে ওই তিন দেশের নাগরিকদের জন্য নতুন করে আর কোনো কাজের ভিসা ইস্যু করার আইনি সুযোগ থাকবে না। তবে সরকার এটিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, যেসব বিদেশি কর্মী ইতোমধ্যে বৈধভাবে হাঙ্গেরিতে অবস্থান করছেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন, তারা চাইলে যথাযথ নিয়ম মেনে তাদের বর্তমান ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করতে পারবেন।

 

এছাড়া, নতুন এই নির্দেশিকা কার্যকর হওয়ার পূর্বে ভিসা প্রাপ্তির জন্য জমা দেওয়া আবেদনগুলোও আগের নিয়মানুযায়ী যথারীতি মূল্যায়ন করা হবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে।

 

সরকারের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হাঙ্গেরিতে বৃহৎ পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করা বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।

 

তারা বর্তমান সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছে যে, দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও শিল্পোৎপাদন খাত যেহেতু বিদেশি শ্রমের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল, তাই বিকল্প ব্যবস্থা না করে এভাবে হঠাৎ বিদেশি শ্রমিকদের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হলে তা কোম্পানিগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

 

দীর্ঘমেয়াদে এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত হাঙ্গেরির সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির ওপর একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রবল আশঙ্কা করছেন।

 

রয়টার্স