মূলত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যেই দেশটির নগর কর্তৃপক্ষগুলো এই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ইনফোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী প্যারিসের পুলিশ প্রশাসন সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত প্লাস দে লা রিপাবলিক এবং লেস হালেস জেলার কিছু অংশে কারফিউয়ের সময়সীমা সম্প্রসারিত করেছে।
এই নির্দেশনার আওতায় স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত এগারোটা থেকে বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে জনসাধারণের চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকবে। একই সাথে নিরাপত্তা শঙ্কা বিবেচনা করে অনুমোদনহীন যেকোনো ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা হয়েছে।
এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে রাত আটটা থেকে পরদিন সকাল ছয়টা পর্যন্ত, যা এলিসি প্রাসাদ, জাতীয় সংসদ ভবন, সিনেট, শঁজেলিজে অ্যাভিনিউ, শাতলে এলাকা এবং প্রধান প্রধান রেলস্টেশনের মতো রাজধানীর অতি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থানগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
রাজধানীর বাইরে দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর কেন্দ্র লিয়নেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সেখানে নগরকেন্দ্রে আরোপিত সান্ধ্যকালীন কারফিউ রাত নয়টা থেকে পরদিন সকাল ছয়টা পর্যন্ত বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি জমায়েতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা দুই ঘণ্টা এগিয়ে এনে সন্ধ্যা ছয়টার পরিবর্তে বিকেল চারটা থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে কারফিউ শুরু হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকাশ্য জনসমাগম সীমিত করে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ও সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতেই এই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। এদিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মার্সেইয়ে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এক ব্যতিক্রমী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নগরীর মেয়র বেনোয়া পায়ান অপ্রাপ্তবয়স্ক বা কিশোরদের ঘরের বাইরে থাকার ওপর নির্দিষ্ট সময়ের বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, নগরকেন্দ্রের নির্ধারিত কিছু অংশে মঙ্গলবার রাত দশটা থেকে পরদিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে এই সীমাবদ্ধতা কার্যকর থাকবে এবং আগামী কয়েক দিন ধরে তা বলবৎ রাখা হবে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে দূরে রাখা এবং নৈশকালীন বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফ্রান্সের অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতেও একই ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তুলুজে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে সেখানে নৈশকালীন কারফিউ কার্যকর হবে, যা রবিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই শহরে মধ্যরাত বারোটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
এছাড়া দেশটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহর যেমন বোর্দো এবং নিসে পূর্বঘোষিত সান্ধ্যকালীন বিধিনিষেধগুলো কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী চালু রাখা হবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি এবং নতুন করে সম্ভাব্য বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণার কারণে দেশটির ক্রীড়াঙ্গনেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ফরাসি পেশাদার ফুটবল লিগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার নির্ধারিত লিগ টু প্রতিযোগিতার মঁপেলিয়ে ও প্যারিসের রেড স্টারের মধ্যকার ফুটবল ম্যাচটি স্থগিত করা হয়েছে।
সরকারি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার বিকেলের এই ম্যাচটি পিছিয়ে আগামী সোমবার অনুষ্ঠানের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। স্টেডিয়াম এলাকায় জননিরাপত্তা বজায় রাখা এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর থেকে বাড়তি চাপ কমাতেই ম্যাচটি পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, গত শনিবার ফ্রান্সে ব্যাপক আকারে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত একশত দশটি পৃথক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ নাগরিক অংশগ্রহণ করেন। কেবল রাজধানী প্যারিসেই আনুমানিক এক লাখ দশ হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে সারা দেশে পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রায় চারশত জনকে আটক করে। এই ব্যাপক অস্থিরতার পর থেকেই সম্ভাব্য নতুন সংঘাত এড়াতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।