তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক 'ডিজিটাল জার' এবং প্রতিযোগিতা বিষয়ক কমিশনার মার্গ্রেথ ভেস্টেগার এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য ইউরোপ তার নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে পারে না। সোমবার ব্রাসেলসে ইউরোপীয় এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
জুলাই মাসে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের বিষয়ে উভয় পক্ষ একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর এটিই ছিল তাদের প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এবং বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইউরোপ যদি তাদের 'ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট' (DMA) এবং 'ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট' (DSA)-এর প্রয়োগ কিছুটা নমনীয় করে, তবে এই শুল্কের বোঝা কমানো সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই আইনগুলো মার্কিন টেক জায়ান্টদের প্রতি কঠোর এবং এর প্রয়োগ আরও 'ভারসাম্যপূর্ণ' হওয়া উচিত। এই প্রেক্ষাপটে মার্গ্রেথ ভেস্টেগার ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউরোপের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। দীর্ঘ এক দশক ধরে ইউরোপের প্রযুক্তি নীতি নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করা ভেস্টেগার বলেন, "এই আইনগুলো কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি।
আমরা ইউরোপীয় নাগরিকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, ডিজিটাল সেবাগুলো তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং গণতন্ত্রের জন্য নিরাপদ হবে। কোনো বাণিজ্যিক চাপের মুখে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ইউরোপের জন্য শোভনীয় নয়।" ভেস্টেগার তার মেয়াদকালে গুগল, অ্যাপল, মেটা এবং অ্যামাজনের মতো বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, যার কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে 'ট্যাক্স লেডি' বা 'কর আদায়কারী নারী' হিসেবে অভিহিত করতেন।
ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মার্কিন প্রস্তাবের বিপরীতে যুক্তি দিচ্ছেন যে, বাণিজ্য শুল্ক এবং ডিজিটাল আইন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় এবং এগুলোকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ইউরোপীয় কমিশনের বর্তমান টেক কমিশনার হেনা ভির্কুনেনও ভেস্টেগারের সুরেই কথা বলেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ডিএমএ এবং ডিএসএ ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাজারের শৃঙ্খলার জন্য অপরিহার্য এবং এগুলো শিথিল করার কোনো প্রশ্নই আসে না।
ইউরোপের বাণিজ্য প্রধান মারোস সেফকোভিচ যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, ইউরোপের আইন কোনো নির্দিষ্ট দেশের কোম্পানির প্রতি বৈষম্যমূলক নয়। ইউরোপের বাজারে ব্যবসা করতে হলে যে কোনো দেশের কোম্পানিকেই সমান নিয়ম মেনে চলতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত তাদের বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণের হাত থেকে বাঁচাতে শুল্ক মওকুফের লোভনীয় প্রস্তাব দিচ্ছে।
কিন্তু ইউরোপ যদি এই প্রস্তাবে রাজি হয়, তবে তা হবে তাদের সার্বভৌম আইন প্রণয়নের ক্ষমতার ওপর একটি বড় আঘাত। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভুল ধারণা ভাঙাতে এবং একই সঙ্গে নিজেদের শিল্পের ওপর থেকে শুল্কের বোঝা কমাতে। তবে ভেস্টেগারের দৃঢ় বার্তা এটিই প্রমাণ করে যে, নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং বাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে আপস করতে ইউরোপ মোটেও প্রস্তুত নয়। আগামী দিনগুলোতে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রযুক্তি ও বাণিজ্য নিয়ে দর কষাকষি আরও তীব্র হতে পারে।