এই প্রস্তুতি স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেও, বর্তমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখে এতে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জার্মানি এই পরিকল্পনাটি প্রায় আড়াই বছর আগে খসড়া করেছিল, যা এখন পূর্ণ গতিতে কার্যকর করা হচ্ছে। জার্মান কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ২০২৮ বা ২০২৯ সালের মধ্যেই রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, সংকটের সময়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো যাতে সংবিধান মেনে দ্রুত এবং সমন্বিতভাবে গ্রহণ করা যায় তা নিশ্চিত করা। জার্মানি নিজেকে ন্যাটোর প্রতিরক্ষার ‘কেন্দ্রবিন্দু’ বা প্রধান লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলছে, যেখানে বেসামরিক ও সামরিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
জার্মানির বর্তমান অবকাঠামো, বিশেষ করে জরাজীর্ণ সেতু, সরু টানেল এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৈন্য চলাচলের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে হামবুর্গে ‘রেড স্টর্ম ব্রাভো’ নামক একটি মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ন্যাটোর সৈন্যদের কাল্পনিক আগমনের দৃশ্যপট তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু মহড়ায় দেখা যায়, সাধারণ যানজট, ড্রোন হামলা এবং বিক্ষোভের কারণে সামরিক কনভয়গুলোর গতি ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
মাত্র দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই তাদের দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে, যা বাস্তব যুদ্ধপরিস্থিতিতে বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় জার্মানি বেসরকারি খাতের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, রাইনমেটাল-এর মতো সংস্থাগুলো সৈন্যদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প, জ্বালানি ও খাবারের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিতে পারে। এছাড়া, রেললাইন ও সড়কপথের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ‘নিম্নস্তরের এজেন্ট’ বা গুপ্তচরদের মাধ্যমে এমন হামলার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাব করা হলেও, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন উড্ডয়ন নিয়ে আইনি জটিলতা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও রাশিয়া দ্রুত তাদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, সামরিক ইতিহাসবিদদের মতে, গত গ্রীষ্মই হয়তো ছিল আমাদের জন্য শান্তির শেষ গ্রীষ্ম। ২০২৯ সাল বা তার আগেই রাশিয়া ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে আঘাত হানার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলতে পারে। জার্মানির এই ব্যাপক প্রস্তুতি মূলত সেই আসন্ন ঝড়েরই পূর্বাভাস, যা ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।