ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) চাইছে তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে এবং একই সাথে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে। তবে পরিবেশবাদী ও সমালোচকরা সতর্ক করেছেন যে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার এই দৌড়ে প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
পরিবেশ কমিশনার জেসিকা রসওয়াল এই পরিকল্পনা ঘোষণা করে স্পষ্ট করেছেন যে, “বায়ো-ইকোনমি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং এটি বাস্তব।” বর্তমানে ইউরোপে এই খাতের বাজারমূল্য প্রায় ২.৭ ট্রিলিয়ন ইউরো এবং এতে ১ কোটি ৭১ লাখের বেশি মানুষ কর্মরত। নতুন কৌশলের আওতায় উদ্ভিজ্জ খাদ্য, প্রাকৃতিক ওষুধ, এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সামগ্রীর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তি যাতে ইউরোপের বাইরে চলে না যায়, সে লক্ষ্যে ব্রাসেলস এখন নতুন পণ্যের অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করতে চাইছে। এই কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো নির্মাণ খাত ও প্লাস্টিক শিল্পের পরিবর্তন। কমিশন মনে করে, কাঠ, খড়, এবং ফাইবার-ভিত্তিক উপকরণের ব্যবহার বাড়িয়ে ভবনের কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
এছাড়া কৃষি ও খাদ্যের বর্জ্য এবং বনজ অবশিষ্টাংশ বা ‘সেকেন্ডারি বায়োম্যাস’ ব্যবহার করে ব্যাটারির অ্যানোড বা প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরির কথাও ভাবা হচ্ছে। এটি একদিকে যেমন বর্জ্য কমাবে, অন্যদিকে শিল্প খাতের উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করবে। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার বিপরীতে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন মনে করছে, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে প্রকৃতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি হবে, তা শেষ পর্যন্ত টেকসই হবে না। ‘ফার্ন’ এবং ‘জিরো ওয়েস্ট ইউরোপ’-এর মতো সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, পৃথিবীর সম্পদ অসীম নয়।
বর্তমান ভোগবাদিতা বজায় রেখে কেবল পণ্যের উপাদান পরিবর্তন করলে সমস্যার সমাধান হবে না, বরং তা বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাদের মতে, বন ব্যবস্থাপনা ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা না করে প্যাকেজিং বা জ্বালানির জন্য প্রকৃতির নির্বিচার ব্যবহার বা ‘বায়োম্যাস’ আহরণ উল্টো জলবায়ু সংকটকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ইউরোপের এই নতুন কৌশল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্য কতটুকু বজায় রাখতে পারবে, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।