গত কয়েক দশক ধরে বিনিয়োগকারীরা লক্ষ্য করেছেন যে, ক্যালেন্ডারের শেষ মাসে শেয়ারবাজারের পর্দা প্রায়শই সবুজাভ বা ইতিবাচক থাকে। তবে এই উৎসবমুখর পরিবেশের পেছনে কেবল আবেগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যানগত ভিত্তি কাজ করে। গত চার দশকের বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ডিসেম্বর মাসে প্রায় ৭৪ শতাংশ সময় ইতিবাচক অবস্থানে ছিল, যেখানে মাসিক গড় মুনাফার হার ১.৪৪ শতাংশ।
নভেম্বরের পরেই এটি বছরের দ্বিতীয় সেরা মাস হিসেবে বিবেচিত হয়। এই মৌসুমী আনন্দের রেশ ইউরোপীয় বাজারগুলোতেও স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য কোম্পানিগুলোর সূচক ‘ইউরো স্টক্স ৫০’ ডিসেম্বরে গড়ে ১.৮৭ শতাংশ মুনাফা অর্জন করেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সূচকটি বছরের অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় ডিসেম্বরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যকবার, অর্থাৎ ৭১ শতাংশ সময় ইতিবাচক অবস্থানে থেকে মাস শেষ করেছে।
সূচকটির ইতিহাসে সবচেয়ে সেরা ডিসেম্বর ছিল ১৯৯৯ সাল, যখন এটি ১৩.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং সবচেয়ে খারাপ সময় ছিল ২০০২ সাল, যখন এটি ১০.২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। দেশভিত্তিক সূচকগুলোর দিকে তাকালে এই মৌসুমী প্রবণতা আরও জোরালোভাবে ফুটে ওঠে। গত ৪০ বছরে জার্মানির প্রধান সূচক ‘ড্যাক্স’ ডিসেম্বর মাসে গড়ে ২.১৮ শতাংশ মুনাফা দেখিয়েছে, যা এপ্রিলের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
একইভাবে, ফ্রান্সের ‘ক্যাক ৪০’ সূচকটিও ডিসেম্বরে গড়ে ১.৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে ইতিবাচক থাকে। স্পেন এবং ইতালির শেয়ারবাজারগুলোও এই সময়ে ধারাবাহিক শক্তিশালী অবস্থান বজায় রাখে। তবে মজার বিষয় হলো, ডিসেম্বরের এই জাদুকরী প্রভাব মাসের শুরুতেই দেখা যায় না; বরং ১৫ই ডিসেম্বরের পর থেকে বছরের শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে প্রকৃত গতি সঞ্চারিত হয়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন প্রতি বছর ডিসেম্বরে এই ধরনের ঘটনা ঘটে? এর উত্তর নিহিত রয়েছে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বা তহবিল ব্যবস্থাপকদের আচরণের ওপর। সিজনেক্স-এর বিশ্লেষক ক্রিস্টোফ গেইয়ারের মতে, বছর শেষ হওয়ার আগে অনেক তহবিল ব্যবস্থাপক তাদের পোর্টফোলিও বা বিনিয়োগ তালিকা নতুন করে সাজান।
তারা তাদের গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের সামনে ভালো বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপনের লক্ষ্যে শেষ মুহূর্তের কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। একে বলা হয় ‘প্রাইস মেইনটেনেন্স’ বা মূল্যের রক্ষণাবেক্ষণ। এই প্রক্রিয়ায় তারা এমন সব শেয়ার কেনেন যেগুলো ইতিমধ্যে ভালো পারফর্ম করছে বা স্বল্পমেয়াদে ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে যখন বাজার একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে ওঠানামা করে, তখন এই আচরণটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন, চলতি বছরের মে মাস থেকে জার্মানির ড্যাক্স সূচকটি একটি স্থিতাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ডিসেম্বরের আগমনে এই স্থিতাবস্থা ভেঙে বাজারের উর্ধ্বমুখী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ডিসেম্বরের এই শক্তিশালী অবস্থান কেবল উৎসবের আমেজ বা আশাবাদের ফল নয়; বরং এটি মৌসুমী পরিসংখ্যান, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কৌশল এবং বাজারের প্রযুক্তিগত অবস্থানের একটি সম্মিলিত ফলাফল। তবে মনে রাখা জরুরি, অতীতের পারফরম্যান্স কখনোই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেয় না, তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বদা সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়।