মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৩, ২০২৬
৩০ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বেলারুশের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০১:০১ পিএম

বেলারুশের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ছবি: AP

দীর্ঘদিন ধরে চলা কূটনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলারুশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নাটকীয় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বেলারুশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি পণ্য পটাশ সারের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রত্যুত্তরে বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো ১২৩ জন বন্দীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।

 

মুক্তিপ্রাপ্তদের এই তালিকায় রয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মানবাধিকার কর্মী অ্যালেস বিয়ালিয়াৎস্কি এবং দেশটির বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেত্রী মারিয়া কোলেসনিকোভা। শনিবার বেলারুশের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রেস সার্ভিস থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গুপ্তচরবৃত্তি ও সন্ত্রাসবাদের মতো গুরুতর অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত এসব বন্দীদের মুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিশেষ সমঝোতার ভিত্তিতে।

 

মুক্তিপ্রাপ্ত ১২৩ জনের মধ্যে কেবল বেলারুশের নাগরিকই নন, বরং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের নাগরিকরাও রয়েছেন। তবে একটি নজিরবিহীন ঘটনায়, মুক্তিপ্রাপ্ত বেলারুশিয়ান নাগরিকদেরও নিজ দেশে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি; সকলকেই তাৎক্ষণিকভাবে দেশ থেকে ‘ডিপোর্ট’ বা বহিষ্কার করা হয়েছে। এর আগে গত নভেম্বরের শেষভাগে আরও কিছু বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

 

সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় মুক্তি পাওয়া বন্দীর সংখ্যা এখন ১৫৬ জনে দাঁড়িয়েছে। মুক্ত হওয়া হাই-প্রোফাইল বন্দীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ভিক্টর বাবারিকো এবং জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম টিইউটি.বিওয়াই (TUT.BY)-এর সাবেক প্রধান সম্পাদক মারিনা জোলোতোভা। মারিনা ২০২৩ সালে ১২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে জেল খাটছিলেন।

 

এছাড়াও মানবাধিকার সংস্থা ‘ভিয়াসনা’-র ভ্যালেন্টিন স্টেফানোভিচ এবং ভ্লাদিমির ল্যাবকোভিচও এই সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পেয়েছেন। এই ঘটনার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে মিনস্কে প্রেসিডেন্ট লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত জন কোল পটাশ সারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশেই এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হচ্ছে।

 

জন কোল বলেন, “এটি বেলারুশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। দুই দেশের সম্পর্ক যত স্বাভাবিক হবে, ততই ধাপে ধাপে বাকি নিষেধাজ্ঞাগুলোও তুলে নেওয়া হবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে দুই দেশের মধ্যে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক বারুদ আর অবশিষ্ট থাকবে না।

 

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের পর ব্যাপক কারচুপি ও দমন-পীড়নের অভিযোগে পশ্চিমা বিশ্ব লুকাশেঙ্কো সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির অর্থনীতির প্রাণভোমরা বেলারুশকালি বা পটাশ সারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সংকটের আগে বেলারুশ পটাশ সার রপ্তানি করে বছরে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার আয় করত, যা দেশটির মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮ শতাংশ এবং জিডিপির ৪ শতাংশ দখল করে ছিল। ফলে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেশটির অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা বয়ে এনেছে।

 

মার্কিন দূত জন কোল আরও জানান, লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে শুক্র ও শনিবারের আলোচনা ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। আলোচনায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধের বিষয়টিও উঠে আসে। কোল উল্লেখ করেন যে, ইউক্রেন সংঘাত নিরসনে লুকাশেঙ্কো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়েছেন।

 

এর আগে গত সেপ্টেম্বরেও মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফরের পর ৫১ জন বন্দীকে মুক্তি দিয়ে লিথুয়ানিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেলারুশের অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

- Euro News