কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে তিনি এই চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানকে দমন বা পরাজিত করার যে ধারণার ওপর ভিত্তি করে নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে তাঁর রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক প্রচার চালিয়েছেন, সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলি এবং তেহরানের শক্তিশালী প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে সম্পূর্ণ ভুল এবং অকার্যকর প্রমাণ করেছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানকে একঘরে করা এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা ছিল নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি।
তবে গিডিয়ন লেভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দফায় বড় ধরনের হামলা চালানো হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের পক্ষে কোনো উল্লেখযোগ্য বা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসেনি।
নেতানিয়াহুর মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, প্রবল শক্তি ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এই আঞ্চলিক পরাশক্তিকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমান সময়ের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং দুই দেশের মধ্যকার সামরিক ভারসাম্য এটিই প্রমাণ করেছে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই কৌশল মোটেও বাস্তবসম্মত বা দূরদর্শী ছিল না।
লেভি আরও উল্লেখ করেন, নেতানিয়াহু হয়তো নিজের মনের গভীরে এখন এটি অনুধাবন করতে পেরেছেন যে তাঁর দীর্ঘদিনের অনুসৃত এই যুদ্ধংদেহী কৌশল প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
যদিও রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে তিনি প্রকাশ্যে কখনোই এই পরাজয় বা ব্যর্থতা স্বীকার করছেন না, তবুও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তাঁর এই নীতির ব্যর্থতার চিত্রই বিশ্বমঞ্চে ফুটিয়ে তুলছে।
এমন এক জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতির মধ্যেই ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী নতুন করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছেন।
তারা প্রধান মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ পরামর্শ ও হুঁশিয়ারিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যে এককভাবে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা যুদ্ধ অব্যাহত রাখার জন্য সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছেন।
ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার এমন উগ্র অবস্থানকে অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন বিশ্লেষক গিডিয়ন লেভি। এই কট্টরপন্থী মন্ত্রীদের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে এককভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো দায়িত্বহীন কথা বলছেন, তারা আসলে ভবিষ্যৎ পরিণতির জন্য জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহি করেন না।
ফলে ক্ষমতার চেয়ারে বসে অত্যন্ত সহজেই তারা নিজেদের একক শক্তিতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার স্লোগান দিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবসম্মত সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে এটি স্পষ্ট যে, এককভাবে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ইসরায়েলের নেই।
ইরান প্রশ্নে নতুন করে কোনো বড় ধরনের সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া হলে তা ইসরায়েলের কাঙ্ক্ষিত সামরিক লক্ষ্য বা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না, বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে এক ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা এবং অন্তহীন সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।