মঙ্গলবার ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, সৌদি আরবের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে এবং দেশটির নাগরিকদের ওপর হুতিদের নিরবচ্ছিন্ন আক্রমণ প্রতিহত করতে তারা সেখানে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করতে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ঘটনাকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত বাঁক হিসেবে বর্ণনা করছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে যে, রিয়াদের প্রতি তাদের এই নতুন সামরিক সহায়তা সম্পূর্ণভাবে ‘অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা’ চুক্তির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
মূলত সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় এবং নিশ্ছিদ্র করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া বিস্তারিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং জাতীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত অতি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবকাঠামো ও স্থাপনাগুলোকে যেকোনো ধরনের আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখতে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স বা আরএএফ-এর অত্যাধুনিক টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হবে।
এই যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আরবের আকাশে নিয়মিত প্রতিরক্ষামূলক কাউন্টার-এয়ার মিশন বা আকাশপথে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার অভিযান পরিচালনা করবে।" তবে এই সামরিক মোতায়েনের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বিবৃতিতে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্রিটিশ বাহিনীর এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো নিছকই প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে এবং কোনো অবস্থাতেই এগুলো ইয়েমেনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে হুতি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক বা আগ্রাসী বিমান হামলা পরিচালনা করবে না।
আকাশপথে যুদ্ধবিমান দিয়ে সরাসরি সামরিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি লজিস্টিক বা কৌশলগত সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও রিয়াদকে বিশাল সুবিধা দিতে যাচ্ছে লন্ডন। ব্রিটিশ সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র সৌদি আরবের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত ও নিরাপদে স্থানান্তরের সুবিধার্থে যুক্তরাজ্য সেখানে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ মোতায়েন করবে।
এর পাশাপাশি, সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর স্টাফ অফিসারদের সার্বিক রণকৌশল নির্ধারণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য একদল অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টাকেও সেখানে পাঠানো হবে।
মূলত সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করার লক্ষ্যেই এই সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
এই সামরিক মোতায়েনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি তার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, "আমাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র সৌদি আরবের ওপর হুতিদের এই অব্যাহত, নির্বিচার এবং বর্বরোচিত হামলা সম্পূর্ণভাবে ন্যক্কারজনক ও অগ্রহণযোগ্য।"
তিনি বিশেষ করে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে চালানো ধারাবাহিক হামলার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের চলাচলের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্রকে এভাবে যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার মাধ্যমে হুতি বিদ্রোহীরা প্রমাণ করেছে যে, তারা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের পরিস্থিতিকে একটি ভয়ংকর অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিতে এবং সংঘাতকে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করতে যেকোনো পর্যায় পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।
সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার মাত্রা ও ভয়াবহতা অতীতের যেকোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মাসের শুরু থেকেই রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে অন্তত বিশবার বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
এই ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সর্বশেষ ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১৩ জন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং তিন শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা কেবল সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই বিশাল হুমকি নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়মকানুন এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবেও বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেবল আকাশপথেই নয়, সমুদ্রপথেও হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরব এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিশাল একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর হুতিরা কার্যত সৌদি আরবের ওপর এক ধরনের অঘোষিত নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। তারা নিয়মিতভাবে লোহিত সাগর এবং এর আশপাশের কৌশলগত নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী বিশালাকার ট্যাংকার এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে।
লোহিত সাগর দিয়ে বিশ্বের একটি বিশাল অংশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়ে থাকে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। হুতিদের এই আগ্রাসী নৌ অবরোধ এবং তেলবাহী জাহাজে ক্রমাগত হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে গভীর উদ্বেগ ও অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে।
একই সঙ্গে তারা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরের ওপর বৃষ্টির মতো দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে দেশটির জনজীবনকে চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির শেকড় মূলত ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী এবং রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের গভীরে নিহিত।
২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং বৈধ সরকারকে সমর্থন জানিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামরিক জোট যখন দেশটিতে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন থেকেই এই সংঘাত একটি আঞ্চলিক রূপ লাভ করে।
দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও, গত সেপ্টেম্বর মাসে সেই বহু বছরের কাঙ্ক্ষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ে। চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে পুনরায় তীব্র মাত্রায় সংঘাত, গোলাগুলি এবং বিমান হামলা শুরু হয়েছে, যা ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবনে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে এবং সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তাকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল সংঘাতের নেপথ্যে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি প্রক্সি যুদ্ধের সুস্পষ্ট রূপ দেখতে পাচ্ছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা। শুরু থেকেই সৌদি আরব, ইয়েমেনের বৈধ সরকার এবং তাদের পশ্চিমা মিত্র বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত জোরালোভাবে অভিযোগ করে আসছে যে, হুতি বিদ্রোহীদের পেছনে মূল মদদদাতা হিসেবে কাজ করছে আঞ্চলিক পরাশক্তি ইরান।
তাদের দাবি, তেহরান নিয়মিতভাবে হুতিদের বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, অর্থ এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তবে ইরান সরকার প্রথম থেকেই এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা দাবি করে যে, হুতিদের প্রতি তাদের সমর্থন কেবল রাজনৈতিক এবং আদর্শিক।
তবে এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার এই গভীর অবিশ্বাসের কারণে ইয়েমেন সংকট সমাধানের পথ দিন দিন আরও বেশি জটিল ও দুর্গম হয়ে পড়ছে, যার পরিণতিতে যুক্তরাজ্যকে এখন সরাসরি সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।