ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তিনি সৌদি আরবকে একটি আধুনিক, অর্থনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় এবং প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করার যে সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বর্তমানে নানামুখী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সাম্প্রতিক এক অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত বিশ্লেষণে এই চাঞ্চল্যকর এবং উদ্বেগজনক চিত্রটি উঠে এসেছে। ওই বিশ্লেষণে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সৌদি যুবরাজের গৃহীত মূল নীতি, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখাগুলো বর্তমানে একসঙ্গে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তার নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলোর প্রকৃত কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ সাফল্য নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে গুরুতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রধান কয়েকটি কৌশলগত এবং ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য বর্তমানে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট এবং গভীর সংকট তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতকে কেন্দ্র করে।
ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে বিজয় অর্জন এবং নিজেদের সীমানাকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার যে প্রত্যাশা সৌদি নেতৃত্ব করেছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং বছরের পর বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য একটি গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।
কাঙ্ক্ষিত সামরিক ও কৌশলগত ফল অর্জিত না হওয়ার পাশাপাশি উল্টো চলমান এই উত্তেজনার কারণে খোদ সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা এবং সামগ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নতুন করে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
হুথি বিদ্রোহীদের প্রতিনিয়ত ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তাকে এক অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। এই সামরিক এবং কৌশলগত সংকটের পাশাপাশি কূটনৈতিক ফ্রন্টেও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত শীতল প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মতো ঐতিহাসিক এবং শক্তিশালী মুসলিম মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা নানাবিধ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্বাক্ষরিত হলেও, প্রয়োজনের মুহূর্তে তাদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যান্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সৌদি আরবের এক ধরনের কূটনৈতিক সংহতি বা বাহ্যিক ঐক্য বজায় রয়েছে ঠিকই, কিন্তু যখনই সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ বা সক্রিয় সহায়তার প্রশ্ন সামনে আসছে, তখন মিত্রদের এই সহায়তা অত্যন্ত সীমিত এবং শর্তযুক্ত বলে প্রমাণিত হচ্ছে।
এর ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে সৌদি আরবকে অনেক ক্ষেত্রেই একা নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হচ্ছে, যা দেশটির সামরিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে, শুধু সামরিক বা ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, অর্থনৈতিক অঙ্গনেও সৌদি আরব বর্তমানে এক অভূতপূর্ব পরীক্ষার সম্মুখীন। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশটিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানোর জন্য যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং যুগান্তকারী ‘ভিশন ২০৩০’ বা অর্থনৈতিক রূপান্তর এজেন্ডা ঘোষণা করেছিলেন, সেটিও বর্তমানে গুরুতর চাপের মুখে পড়েছে।
এই মহাপরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রযুক্তি, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে সৌদি অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনা। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত সমন্বয়হীনতার কারণে এই স্বপ্ন পূরণের পথে একাধিক বড় বাধা এসে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে তহবিলের চরম সংকট এবং অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে সৌদি আরবের পরিকল্পিত অনেকগুলো বড় এবং মেগা প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে বিলম্বিত হচ্ছে। ভিশন ২০৩০-এর অধীনে যেসব আধুনিক শহর বা অবকাঠামো নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এর পাশাপাশি ইয়েমেন যুদ্ধ এবং হুথি বিদ্রোহীদের অব্যাহত হুমকির কারণে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিরক্ষা বাজেটে বিপুল পরিমাণ অর্থ নতুন করে বরাদ্দ করতে হচ্ছে। উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত বাজেট কেটে সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে এই পুনঃবণ্টনের প্রয়োজনীয়তা যুবরাজের স্বপ্নের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে মারাত্মক পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, সেটিও বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা যেকোনো দেশে তাদের পুঁজি খাটানোর আগে সেই দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।
সৌদি আরবের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি অব্যাহত থাকলে এবং সামরিক উত্তেজনার পারদ ঊর্ধ্বমুখী থাকলে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট দেখা দিলে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ স্থবির হয়ে পড়ার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা সৌদি আরবের সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত।
সব মিলিয়ে, ভূরাজনৈতিক রণাঙ্গন এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামো-এই উভয় ফ্রন্টেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে বর্তমানে এক অত্যন্ত জটিল, পরিবর্তনশীল এবং ভারসাম্য রক্ষার কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।
একদিকে তাকে দেশের সীমান্ত এবং জাতীয় নিরাপত্তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হচ্ছে, অন্যদিকে তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হচ্ছে।
সামরিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার এই যুগপৎ প্রচেষ্টায় বারবার বিঘ্ন ঘটায় তার গৃহীত নীতিগুলোর ভবিষ্যৎ এবং দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানামুখী আলোচনা, সমালোচনা ও পর্যালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
আগামী দিনগুলোতে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কীভাবে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করে তার নেতৃত্ব এবং ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্যমাত্রা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হন, সেটিই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।