আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তার এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সরাসরি সামরিক এবং অর্থনৈতিক সংঘাত প্রায় আট মাস ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক উদ্বেগ ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রেখেছে।
মার্কিন সম্প্রচার সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরান সংকট নিয়ে বিস্তারিত ও খোলামেলা আলোচনা করেন। তিনি ওয়াশিংটনের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ইরানি শাসকদের মানসিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার উগ্র নীতির কারণে তাদের সঙ্গে সফল আলোচনা করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।
রুবিও তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, "ইরানি শাসকদের সাথে কোনো কার্যকরী বা বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে মোটেও দক্ষ বা বাস্তববাদী আলোচক নয়।
বরং তারা পুরোপুরিভাবে কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মীয় নেতাদের কঠোর নির্দেশে ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।" তিনি তার মন্তব্যে আরও যুক্ত করে বলেন, "তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়াই ধর্মীয় মতাদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত এবং পরিচালিত। এমন একটি কট্টর ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে থাকা নেতৃত্বের সাথে আধুনিক কূটনৈতিক শর্তের ভিত্তিতে কোনো গঠনমূলক চুক্তিতে পৌঁছানো অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন।"
এই মন্তব্যের মাধ্যমে মূলত মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, তেহরানের বর্তমান চরমপন্থি নেতৃত্বের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো শান্তি প্রচেষ্টা বারবারই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
উল্লেখ্য, প্রায় দুই দশক ধরে ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে তেহরানের যে দীর্ঘস্থায়ী টানাপোড়েন ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলে আসছিল, তা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ ও প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ বিমান বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে এবং তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোতে একযোগে ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক বিমান অভিযান শুরু করে। এই নজিরবিহীন সামরিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই কার্যত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা ঘটে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।
এই আক্রমণ কেবল সামরিক দিক থেকেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসেও এক নতুন, অপ্রত্যাশিত ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সংঘাত শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালিতে।
এই প্রণালিটি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান একটি নৌপথ, যার ওপর এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশের অর্থনীতি নির্ভরশীল। সামরিক হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে এবং জাহাজ চলাচলে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করতে শুরু করে।
তেহরানের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা কৌশল গ্রহণ করে এবং আন্তর্জাতিক নৌপথ ব্যবহার করে ইরানের নিজস্ব বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ জারি করে। উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি এবং আগ্রাসী অবরোধের কারণে গত আট মাস ধরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এক নজিরবিহীন অস্থিরতা ও সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, সরবরাহ চেইনে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক বিশাল অর্থনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী বেসামরিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ইরান যেসব পরিকল্পিত আক্রমণ চালিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার অত্যন্ত কঠোর, তীক্ষ্ণ ও দ্ব্যর্থহীন সমালোচনা করেছেন।
বাণিজ্যিক জাহাজে সামরিক হামলার এই কৌশলকে তিনি আধুনিক বিশ্ব ইতিহাসের এক ভয়াবহ ও কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রুবিও তার মন্তব্যে এই হামলাগুলোকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের জন্য সম্পূর্ণ ‘নজিরবিহীন’ একটি ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি এই কৌশলকে সরাসরি অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কুখ্যাত সাবমেরিন বা ইউ-বোট কৌশলের সাথেও তুলনা করেছেন, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আটলান্টিক মহাসাগরে মিত্রবাহিনীর পণ্যবাহী ও বেসামরিক জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার এক নিষ্ঠুর ও অমানবিক নীতি গ্রহণ করেছিল।
মার্কো রুবিও গভীর উদ্বেগের সাথে বলেন, "আমরা বর্তমান যুগে এমন একটি দেশের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছি, যারা প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জভাবে ঘোষণা করছে যে তারা নিরীহ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে তাদের সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা এমন ভয়াবহ ও বেপরোয়া কৌশল আর কখনোই দেখিনি। এটা শুধু আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের লঙ্ঘনই নয়, বরং রীতিমতো নজিরবিহীন একটি অপরাধ। তারা এমন এক ধ্বংসাত্মক কৌশল ব্যবহার করছে যা সরাসরি নাৎসি সাবমেরিনগুলোর সেই অন্ধকার ও ভয়াবহ স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।
এটি এমন একটি গুরুতর বিষয়, যার তীব্র নিন্দা জানাতে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আজ পুরো বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।" এই চলমান ও ধ্বংসাত্মক সংঘাত থামানোর জন্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক নিশ্চিত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক কূটনীতিও বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা। ইসলামাবাদের নিবিড় কূটনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগের ফলে এর মধ্যে অন্তত দুই বার বিবদমান উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে সম্মত হয়েছিল।
এমনকি গত জুন মাসে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এক দীর্ঘ ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পর ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক চুক্তি’ নামে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছিল দেশ দুটি।
আন্তর্জাতিক মহল এই চুক্তিকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখলেও, বাস্তবে এই চুক্তির স্থায়িত্ব ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভূরাজনৈতিক স্বার্থের তীব্র সংঘাত এবং বারবার শর্ত ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগের কারণে এসব শান্তি উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত আর কোনো সুনির্দিষ্ট বা ফলপ্রসূ পরিণতি লাভ করতে পারেনি এবং যুদ্ধ পুনরায় তার ধ্বংসাত্মক গতিতে ফিরে এসেছে।
এই গভীর অচলাবস্থা নিরসনে মধ্যস্থতা তৎপরতার ধারাবাহিক অংশ হিসেবে এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার তাগিদে সম্প্রতি তেহরান সফরে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের সফরে তিনি ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করেন।
বিশেষ করে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি কট্টর সরকারের অন্যতম শীর্ষ মুখপাত্র মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফের সঙ্গে তার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই বৈঠকে তেহরান তাদের অনমনীয় অবস্থান আরও একবার স্পষ্টভাবে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সাথে অনুষ্ঠিত ওই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরান ওয়াশিংটনকে সংঘাত নিরসনের জন্য সুনির্দিষ্ট সাতটি শর্ত দিয়েছে। এই শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম ও প্রধান দাবি হলো, আন্তর্জাতিক ও মার্কিন একতরফাভাবে আরোপিত সমস্ত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
ঘালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন যতক্ষণ না পর্যন্ত এই সাতটি শর্ত পুরোপুরিভাবে মেনে নিচ্ছে এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে না তেহরান।
ইরানের এই অত্যন্ত কঠোর শর্তাবলি এবং ওয়াশিংটনের অনমনীয় অবস্থান-সব মিলিয়ে একটি বিষয় এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, অদূর ভবিষ্যতে এই দুই দেশের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি বা সমঝোতার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।