বুধবার, অক্টোবর ২১, ২০২৬
৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ওয়াশিংটন আস্থা অর্জন না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা নয়।

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:১৮ পিএম

ওয়াশিংটন আস্থা অর্জন না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা নয়।
ছবি : Collected

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে চলমান সংকটের মধ্যে নতুন করে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিয়েছে তেহরান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত এই পারমাণবিক ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সাথে যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আলোচনার সম্ভাবনা আপাতত সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়েছে ইরান।

 

দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা অর্জনে সক্ষম না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে বসবে না তেহরান।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে ২১শে অক্টোবর প্রকাশিত এই সংবাদটি বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে এবং চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে আরও গভীর করে তুলেছে।

 

মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় তার দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে সরকারের অনমনীয় অবস্থানের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।

 

তিনি তার ওই পোস্টে দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন, "ইরান থেকে এক গ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও বাইরে নেওয়া হবে না বা সরানো হবে না।" এই একটি মাত্র বাক্যেই তিনি গোটা পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তেহরানের চরম আপসহীন নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

 

তার এই বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বিগত বছরগুলোতে নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে ইরান যে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা থেকে তারা এক চুলও পিছু হটতে রাজি নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যেকোনো চাপের মুখেও নিজেদের অর্জিত পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়ে তেহরান যে সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তা এই বিবৃতির মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো।

 

ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো আলোচনার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ইরানের এই শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারক অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে না।"

 

তিনি তার বক্তব্যে বারবার এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে, যেকোনো ভবিষ্যৎ আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পূর্বশর্ত হলো ইরানের উত্থাপিত সমস্ত যৌক্তিক দাবি ও শর্তাবলীর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন।

 

ওয়াশিংটন যদি সত্যি সত্যি কূটনৈতিক উপায়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধান চায়, তবে তাদেরকেই প্রথম পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তেহরানের শর্তগুলো বিনা দ্বিধায় মেনে নিতে হবে বলে তিনি জোর দাবি জানান।

 

ইরানের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে তারা এখন আর কেবল ফাঁকা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাসী নয়, বরং বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই চরম অবিশ্বাসের দেয়াল একদিনে তৈরি হয়নি।

 

দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক বৈরিতা এবং বিশেষ করে পারমাণবিক চুক্তি ঘিরে দুই দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম জটিল একটি সমীকরণে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালে ইরান এবং বিশ্বের শক্তিধর ছয়টি দেশের মধ্যে যে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখা এবং এর বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া।

 

কিন্তু ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন একতরফাভাবে এই বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর ও ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। মূলত সেই ঘটনাটিই দুই দেশের মধ্যকার আস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয় এবং ইরানকে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানে ফিরে যেতে বাধ্য করে।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেই একতরফা চুক্তিত্যাগের পর থেকেই ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্তগুলো থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে শুরু করে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ক্রমশ বাড়াতে থাকে। পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং তাদের এই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সেই বৃহত্তর পরিকল্পনারই একটি অংশ।

 

কিন্তু তেহরান শুরু থেকেই এই দাবি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ এবং তা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃষি ও শিল্পের গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য পরিচালিত হচ্ছে।

 

মোহসেন রেজাইয়ের "এক গ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামও বাইরে নেওয়া হবে না" মন্তব্যটি মূলত সেই স্বাধীন ও সার্বভৌম অধিকারেরই একটি জোরালো প্রতিফলন। ইরান বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চাইছে যে, তাদের নিজস্ব মেধা ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম তাদের অমূল্য জাতীয় সম্পদ এবং কোনো বিদেশি পরাশক্তির অন্যায্য চাপের মুখে তারা এই সম্পদ অন্য কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর বা ধ্বংস করবে না।

 

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের এই বক্তব্য কেবল তার ব্যক্তিগত মতামত নয়, বরং এটি ইরানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় নীতি ও দর্শনের সরাসরি প্রতিফলন। ইরানের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত, সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এই পরিষদ, যা সরাসরি দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকনির্দেশনায় পরিচালিত হয়।

 

সুতরাং, মোহসেন রেজাই যখন শর্ত পূরণ এবং আস্থা অর্জনের কথা এত সুনির্দিষ্টভাবে বলেন, তখন বুঝতে হবে যে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র এবং নীতিনির্ধারণী মহল এই একই অবস্থানে সম্পূর্ণ অনড় রয়েছে। তেহরানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র অতীত ইতিহাসে বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং তাদের ওপর অন্যায়ভাবে একতরফা চাপ প্রয়োগের নীতি অবলম্বন করেছে।

 

তাই পূর্বের মতো কোনো প্রহসনের আলোচনা বা কেবল মৌখিক আশ্বাসের ভিত্তিতে নতুন করে প্রতারিত হতে তারা আর কোনোভাবেই রাজি নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন অবস্থান মার্কিন প্রশাসন এবং ইউরোপীয় মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাক্কা।

 

সাম্প্রতিক সময়ে পর্দার অন্তরালে আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন এবং পরোক্ষ আলোচনার কিছু উদ্যোগের কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের এই সুস্পষ্ট বার্তার পর সেই সমস্ত কূটনৈতিক উদ্যোগের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে গিয়ে পড়ল।

 

তেহরান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কূটনীতির দরজা তাদের তরফ থেকে একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হয়নি ঠিকই, তবে সেই দরজা খোলার একমাত্র চাবি রয়েছে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।

 

ওয়াশিংটনকে এখন শুধু কথার ফুলঝুরি দিয়ে নয়, বরং কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা ইরানের প্রতি তাদের দীর্ঘদিনের বৈরী ও আগ্রাসী নীতি থেকে সরে এসেছে এবং একটি সম্মানজনক, শর্তহীন ও সমতাভিত্তিক সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি রচনা করতে প্রস্তুত।

 

সার্বিক পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে এটি অত্যন্ত দৃশ্যমান যে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার পারমাণবিক কূটনীতি বর্তমানে এক চরম অচলাবস্থা ও জটিল সন্ধিক্ষণের মধ্যে প্রবেশ করেছে।

 

মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাইয়ের এই বলিষ্ঠ বক্তব্য থেকে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইরান কোনোভাবেই মার্কিন অর্থনৈতিক বা সামরিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। তেহরান তাদের নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা, অখণ্ড সার্বভৌমত্ব এবং শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অধিকারের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতিতে অবিচল রয়েছে।

 

এখন বিশ্ববাসীর দেখার বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে কি না এবং ইরানের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য বাস্তবে কী ধরনের গঠনমূলক ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

 

বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত গভীরভাবে এই দুই বৈরী রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক চাল ও গতিবিধির দিকে সতর্ক নজর রাখছেন, কারণ এই জটিল সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপরই নির্ভর করছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা বলয়।

 

- মেহের নিউজ