বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে ৪টি জাহাজে হামলা ও ৩টিতে মাইন বিস্ফোরণ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:২০ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে ৪টি জাহাজে হামলা ও ৩টিতে মাইন বিস্ফোরণ
ছবি : Collected

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি এবং এর সংলগ্ন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে ব্যাপক সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ঘোষিত জলসীমা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়মবিধি অমান্য করার অভিযোগে একই সাথে চারটি তেলবাহী জাহাজে সরাসরি হামলা চালিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।

 

একই সঙ্গে রাতের অন্ধকারে পেতে রাখা সমুদ্র মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আরও তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ বিকল হয়ে পড়েছে। ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌ শাখার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

তারা দাবি করেছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি নৌযানই অবৈধভাবে ঝুঁকি নিয়ে নিষিদ্ধ সমুদ্রপথ ব্যবহার করছিল এবং স্পর্শকাতর সমুদ্র অঞ্চলে অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নৌবাহিনী এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরের উত্তর-মধ্যাঞ্চলীয় সমুদ্র এলাকায় একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও গোপনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল স্থানান্তর করা হচ্ছিল।

 

বিষয়টি ইরানের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় থাকা নৌ গোয়েন্দা ইউনিটের নজরে আসামাত্রই দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হয়। নৌবাহিনীর বিশেষ দল ওই চারটি নিয়মভঙ্গকারী জাহাজকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত ও তাড়া করে। পরবর্তীতে অত্যন্ত দ্রুত ও যুগপৎ অভিযানের মাধ্যমে সেই চারটি তেলবাহী জাহাজে একসাথে লক্ষ্যভেদী আঘাত হানা হয়।

 

প্রাপ্ত সামরিক তথ্যানুযায়ী, এই অতর্কিত হামলার পর আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিটি জাহাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে এবং সেগুলো সমুদ্রে মারাত্মকভাবে জ্বলতে থাকে। অন্যদিকে এই একই অভিযানের অংশ হিসেবে রাতের অন্ধকারে হরমুজ প্রণালির ঠিক পশ্চিম প্রান্তে আরো একটি বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে।

 

সেখানেও নির্ধারিত আন্তর্জাতিক আইন এবং সুরক্ষাবিধি উপেক্ষা করে অবৈধ পথ ধরে চলাচল করছিল আরও তিনটি বাণিজ্যিক নৌযান। ইরানের নৌবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে পূর্ব থেকেই সমুদ্র সুরক্ষার স্বার্থে পেতে রাখা বিপজ্জনক নৌ মাইনের সংস্পর্শে আসে নৌযান তিনটি।

 

শক্তিশালী মাইন বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই জাহাজগুলো মারাত্মক কাঠামোগত ক্ষতির সম্মুখীন হয় এবং সেগুলোতেও তাৎক্ষণিকভাবে আগুন ধরে যায়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও আগুনের তীব্রতার কারণে শেষ পর্যন্ত জাহাজগুলোর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায় এবং সেগুলো সমুদ্রের মাঝে সম্পূর্ণরূপে অচল অবস্থায় থেমে যেতে বাধ্য হয়।

 

সার্বিক এই সামরিক ও নিরাপত্তামূলক অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করার পর আইআরজিসির নৌ শাখা থেকে একটি দীর্ঘ ও নীতিগত আনুষ্ঠানিক বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ওই বিবৃতিতে সামরিক অভিযানের সাফল্যের মূল কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছে ইরানের সাধারণ জনগণের অটল ও দৃঢ় অবস্থানের প্রতি।

 

সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত আবেগের সাথে উল্লেখ করা হয় যে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরানের জনগণের যে অদম্য সাহসিকতা, ধৈর্য ও অবিচল সমর্থন রয়েছে, মূলত সেটিই দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সর্বোচ্চ মানসিক ও কৌশলগত শক্তি জোগাচ্ছে।

 

জনগণের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের বিরোধীদের জন্য চরম অপমান, নিরাশা ও সামরিক ব্যর্থতা বয়ে নিয়ে এসেছে বলে বিবৃতিতে গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। নৌবাহিনীর নেতৃত্ব দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, সমগ্র জাতির এই দৃঢ় পৃষ্ঠপোষকতাকে পুঁজি করেই ইরানের নৌসেনারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে হরমুজ প্রণালির মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক তদারকি পরিচালনা করে আসছে।

 

ঘটনার পূর্বাপর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর নীতিহীন আচরণের বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। সামরিক মুখপাত্ররা স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইরানের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকল জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিকে আগেই কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।

 

বিবৃতিতে সরাসরি অভিযোগ করা হয় যে, আক্রমণাত্মক মার্কিন সেনাবাহিনীর মিথ্যা প্ররোচনা ও বিভ্রান্তিকর আশ্বাসে প্রভাবিত হয়ে বেশ কিছু জাহাজ কোম্পানি বেআইনি এবং ঝুঁকিপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বেছে নিয়েছিল। সতর্কবার্তা অমান্যকারী সেই জাহাজগুলোর গতিবিধি দীর্ঘদিন ধরেই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি করা হচ্ছিল।

 

তারই ধারাবাহিকতায় যখন পারস্য উপসাগরের উত্তর-মধ্যাঞ্চলে আইন অমান্য করে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়, তখনই সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

 

বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, আন্তর্জাতিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির কারণেই মূলত এই অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বিপজ্জনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া অনৈতিক নীতি এবং জাহাজগুলোকে জোরপূর্বক ঝুঁকিপূর্ণ ও মাইনযুক্ত জলপথ ব্যবহার করতে বাধ্য করার প্রবণতাই প্রতিদিন এই ধরনের সমুদ্র দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।

 

মার্কিন প্রশাসনের এই একগুঁয়েমি ও উসকানিমূলক আচরণকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে তেহরান। তারা জানিয়েছে যে, বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বিভ্রান্ত করে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে, যা দিন দিন সমগ্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

 

সবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রতি অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর। বিবৃতিতে চূড়ান্ত সতর্কতা জারি করে বলা হয় যে, আক্রমণাত্মক মার্কিন সেনাবাহিনীর অবিলম্বে অনুধাবন করা উচিত যে তারা যদি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে এই ধরনের সংঘাত ও উসকানির পরিসর বাড়াতে থাকে, তবে এই যুদ্ধের বিস্তার কেবল জলপথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

 

সংঘাতের এই তীব্রতা খুব দ্রুতই সমগ্র অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন আগ্রাসী সামরিক ঘাঁটিগুলোর অভ্যন্তরে সরাসরি আছড়ে পড়বে। এই স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ বার্তাকে একটি অত্যন্ত গম্ভীর ও জরুরি সতর্কবাণী হিসেবে গ্রহণ করার জন্য পেন্টাগনকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথে সাতটি জাহাজে একযোগে হামলা ও মাইন বিস্ফোরণের এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক সংকটকে সম্পূর্ণ নতুন এবং এক অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।

 

বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা সামরিক সংঘাত তীব্রতর হলে তার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির ওপর পড়বে।

 

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা গভীর উদ্বেগের সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ এই ঘটনা কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সামরিক টানাপোড়েনকেই উস্কে দেবে না, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক সমুদ্রবাণিজ্যের সুরক্ষাকেও এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে নিক্ষেপ করবে।

 

- মেহের নিউজ