বিশেষ করে মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন প্রযুক্তিতে দেশটি এখন এক অভাবনীয় পরিপক্বতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বলে দাবি করেছে তাদের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। একই সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানানো হয়েছে যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চল এবং ওমান সাগরে কোনো শত্রুপক্ষের জাহাজ বিনা অনুমতিতে বা উসকানিমূলকভাবে প্রবেশ করার চেষ্টা করলেই তা সরাসরি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নিখুঁত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং কৌশলগত জলপথে নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে ইরানের এই ঘোষণাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বলে মনে করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যখন নানামুখী সামরিক মেরুকরণ চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তে নিজেদের আকাশ ও জলসীমার নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেহরানের এই অনমনীয় অবস্থান আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি গত বৃহস্পতিবার দেশের একটি বৃহৎ ও অত্যাধুনিক আক্রমণাত্মক যুদ্ধড্রোন উৎপাদনকেন্দ্র সরাসরি পরিদর্শনকালে এই অটল ও আপসহীন অবস্থান ব্যক্ত করেন।
সামরিক বাহিনীর এই শীর্ষ কর্মকর্তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমানে ড্রোন উৎপাদন, সেগুলোর যথাযথ বিতরণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি ধাপে ইরান বৈশ্বিক মানদণ্ডে বিশেষভাবে সক্রিয় ও সম্পূর্ণ স্বনির্ভর একটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
অত্যাধুনিক এসব সমরাস্ত্র নিখুঁতভাবে পরিচালনার জন্য সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় ও উন্নততর দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। মেজর জেনারেল হাতামির মতে, ড্রোনসহ সামগ্রিকভাবে চালকবিহীন আধুনিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে ইরান এখন এমন এক উল্লেখযোগ্য ও ঈর্ষণীয় পরিপক্বতা অর্জন করেছে, যা যেকোনো ধরনের আকস্মিক সামরিক আগ্রাসন অত্যন্ত কঠোরভাবে রুখে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তাঁর এই বক্তব্য থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, ইরান এখন প্রথাগত সমরাস্ত্রের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক সরঞ্জামের দিকে ব্যাপকভাবে মনোনিবেশ করেছে। দেশের সামরিক বাহিনীর বর্তমান প্রস্তুতির সর্বোচ্চ মাত্রা এবং যেকোনো উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতিতে বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করার বাস্তব সক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সেনাপ্রধান সাম্প্রতিক সময়ের দুটি চাপিয়ে দেওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের কথা গভীরভাবে স্মরণ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ওই দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলো থেকে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, যা তাদের বর্তমান সামরিক মতবাদকে নতুন করে সাজাতে সাহায্য করেছে। এসব অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও চিরন্তন শিক্ষা হলো, শত্রুপক্ষকে কোনো অবস্থাতেই সামান্যতম বিশ্বাস করা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সামরিক কৌশলের এই অমোঘ ও নির্মম নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই ইরান নিজেদের সামরিক প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মাতৃভূমি রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির বা শিথিলতার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই বলেও তিনি তাঁর বক্তব্যে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় যুদ্ধকৌশল ও রণনীতির ধরন যে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে, সে বিষয়টিও ইরানের সেনাপ্রধানের অত্যন্ত সময়োপযোগী বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বর্তমানে প্রথাগত ভারী সমরাস্ত্রের চেয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ড্রোন, সামুদ্রিক চালকবিহীন যান (যাকে ফার্সি পরিভাষায় শাহপাদ বলা হয়) এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষুদ্রাকৃতির উড়ন্ত যন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের চালকবিহীন অস্ত্রের ব্যবহার বহুমুখী সামরিক অভিযানে আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবর্তিত এই বিশ্ব সামরিক পরিস্থিতি ও আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইরানের নিজস্ব জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশলেও এসব চালকবিহীন অস্ত্র ও প্রযুক্তি এখন বিশেষ ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব বহন করছে। মূলত শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে নিখুঁত আক্রমণ পরিচালনার ক্ষেত্রে এই চালকবিহীন প্রযুক্তি আধুনিক যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
ইরানের সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক ড্রোনের উন্নয়ন কৌশল, বিশেষ করে দূরপাল্লার ও অত্যন্ত নিখুঁত আক্রমণাত্মক ‘আরাশ’ ড্রোনের বিশাল সাফল্যের প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল হাতামি অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানান, দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিবিড় ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই উন্নত প্রযুক্তির ড্রোনের উন্নয়ন ও গবেষণার দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের এই দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে এই ড্রোন প্রকল্প এক নতুন ও যুগান্তকারী মাত্রা লাভ করে।
বর্তমানে দেশের অত্যন্ত শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো এবং মেধাবী বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী, স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষক ও জ্ঞানভিত্তিক দেশীয় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সর্বোচ্চ সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই কার্যক্রম সম্পূর্ণ শিল্পভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে সমরাস্ত্রের জন্য ইরানকে আর বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না।
যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিদেশি আগ্রাসন মোকাবিলায় ইরানের সেনাবাহিনীর স্থল, নৌ, বিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা-এই চারটি প্রধান শাখার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে সেনাপ্রধান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান যে, প্রতিটি শাখাই এখন সম্পূর্ণ যুদ্ধপ্রস্তুত অবস্থায় সর্বক্ষণ সতর্ক রয়েছে।
অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও রণাঙ্গনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এর আগে সম্পূর্ণ অসম সামরিক সক্ষমতার একটি যুদ্ধে ইরান নিজস্ব প্রযুক্তির এমন সব অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ও অভাবনীয় সামরিক কৌশল ব্যবহার করে লড়াই করেছিল, যা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত অত্যন্ত শক্তিশালী শত্রুপক্ষকে রীতিমতো বিস্মিত, হতবাক ও দিশেহারা করে দিয়েছিল।
তাঁর ভাষায়, সেই চরম অসম যুদ্ধেও আগ্রাসী প্রতিপক্ষকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী, বিধ্বংসী ও অভাবনীয় আঘাত সহ্য করতে হয়েছিল। এই ইতিহাস অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কেবল আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের অধিকারী হওয়াই যথেষ্ট নয়, বরং ইরানের মতো দূরদর্শী ও কৌশলগত অসম যুদ্ধ পরিচালনা বা অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ার যেকোনো প্রবল পরাক্রমশালী প্রতিপক্ষকেও ধরাশায়ী করতে সক্ষম।
বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান লাইফলাইন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধানতম রুট এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চলে সেনাবাহিনীর সার্বিক ও নিয়মিত কার্যক্রম সম্পর্কে মেজর জেনারেল হাতামি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, সম্পূর্ণভাবে ইরানের নৌবাহিনীর প্রত্যক্ষ দায়িত্ব ও নজরদারির অধীন ওই অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকায় সমুদ্রের উপরিভাগ এবং উপকূলরেখা-উভয় স্থানেই তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী, সদাজাগ্রত ও কার্যকর উপস্থিতি রয়েছে।
এই সার্বক্ষণিক, নিবিড় ও সতর্ক উপস্থিতির কারণেই মূলত কোনো শত্রুপক্ষ কখনোই ওমান সাগরে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করার বা কোনো ধরনের সামরিক উসকানি দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিজেদের ভৌগোলিক অধিকার সমুন্নত রাখতে ইরান যে কোনো ধরনের পরাশক্তির চাপের কাছে বিন্দুমাত্র আপস করবে না, সেটিও তাঁর এই কঠোর বার্তায় অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন, সামুদ্রিক বিধিবিধান এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার রক্ষার নিজস্ব সুদৃঢ় ব্যাখ্যার জায়গা থেকে মেজর জেনারেল হাতামি আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, স্বাধীন নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি বা যেকোনো ধরনের সামুদ্রিক অবরোধ আরোপকে ইরান সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে একটি অঘোষিত যুদ্ধেরই অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
সুতরাং, বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক যে বা যারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে এই ধরনের অন্যায্য, বেআইনি ও একতরফা অবরোধ আরোপের অপচেষ্টা করবে, ইরান সরাসরি তাদের রাষ্ট্রের প্রধান শত্রু হিসেবে গণ্য করবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেই অনুযায়ী চরম ও দৃষ্টান্তমূলক সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পিছপা হবে না।
পরিশেষে, হরমুজ প্রণালি, পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মতো কৌশলগত ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল নৌপথগুলোতে নিরাপদ নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নিজস্ব ঘোষিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিধিবিধান শতভাগ কার্যকর ও বলবৎ করতে সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক ও প্রাণঘাতী সরঞ্জাম ব্যবহার শুরু করেছে বলে সেনাপ্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অত্যন্ত বিধ্বংসী ও আধুনিক প্রযুক্তির সামুদ্রিক মাইন এবং কিছু অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা যেকোনো অনুপ্রবেশকারীকে মুহূর্তের মধ্যে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম।
এই কঠোর ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে ইরান মূলত এই অমোঘ বার্তাটিই পুরো বিশ্ববাসীকে দিতে চাইছে যে, নিজেদের জলসীমার নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে এবং কৌশলগত অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা যেকোনো ধরনের চরম সামরিক পদক্ষেপ নিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করবে না।