বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং পবিত্র নগরী মদিনার আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের পরপরই ড্রোনগুলোকে চিহ্নিত করে ভূপাতিত করা হয়। সৌদি জোটের পক্ষ থেকে এই হামলাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে চলমান সংঘাত যে এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে, এই ঘটনা তারই একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। রিয়াদ এবং মদিনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল শহরে এই হামলার অপচেষ্টা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে ড্রোনগুলো ভূপাতিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, হুথি বিদ্রোহীদের উৎক্ষেপণ করা ড্রোনগুলো রিয়াদ এবং মদিনা অঞ্চলের আকাশসীমায় প্রবেশের সাথে সাথেই জোটের নিজস্ব অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলোকে সফলভাবে আটকানো এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বেসামরিক নাগরিক এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জোটের সামরিক বাহিনী সর্বদাই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সন্ত্রাসী হামলা প্রতিহত করতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যে সম্পূর্ণভাবে সক্ষম, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এই সংঘাতের শিকড় লুকিয়ে রয়েছে গত জুলাই মাসের একটি নির্দিষ্ট ঘটনার মধ্যে, যা দুই পক্ষের মধ্যকার বৈরিতাকে চরম আকার ধারণ করতে বাধ্য করেছে। ওই মাসে ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণে সরাসরি বাধা প্রদান করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই বিশেষ উড়োজাহাজে করে ইয়েমেনের হুথি নেতারা তাদের প্রধান মিত্র দেশ ইরান থেকে নিজেদের দেশে ফিরছিলেন। এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
তারা মনে করে, এটি তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হানার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা। ফলশ্রুতিতে, তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে তাদের আক্রমণাত্মক কার্যক্রম বহুগুণে বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
জুলাই মাসের ওই ঘটনার পর থেকেই মূলত হুথিরা তাদের যুদ্ধকৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। তারা প্রথাগত সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সৌদি আরবের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিগুলোর ওপর আঘাত হানার নীতি গ্রহণ করেছে।
প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিমানবন্দর এবং জ্বালানি তেল শোধনাগারগুলোকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। চালকবিহীন সামরিক ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইলের মাধ্যমে তারা ধারাবাহিকভাবে এই স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরবের অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার করা।
তাদের এই ধারাবাহিক হামলার কারণে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হুথিদের এই লাগামহীন আক্রমণের মুখে বসে নেই সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও।
হুথিদের এই ক্রমবর্ধমান হুমকি শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে এবং ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে তাদের সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করার লক্ষ্যে সৌদি জোট ‘অপারেশন ডন অব ইয়েমেন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ নামে একটি নতুন ও সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো হুথিদের সামরিক আস্তানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের অস্ত্র সরবরাহ লাইন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। তবে এই অভিযানের ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়ে পড়েছে।
ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। এই সংঘাতের ফলে অগণিত সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি চরম মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
সাম্প্রতিক এই নানামুখী সংঘাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে হামলার গুরুতর অভিযোগ। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইয়েমেনের এই সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী ইসলাম ধর্মের পবিত্রতম দুটি স্থান-মক্কা ও মদিনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানোর মতো চরম ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের হামলা কেবল সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর আক্রমণ নয়, বরং এটি সারা বিশ্বের কোটি কোটি ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর এক সরাসরি আঘাত। এই অভিযোগের পর গোটা মুসলিম বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেকেই হুথিদের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তবে, হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা মক্কা ও মদিনায় হামলার এই দাবিকে ‘ঘৃণ্য মিথ্যাচার’ এবং ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
হুথিদের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর প্রতি তাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে এবং এই স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর মতো কোনো সামরিক পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য তাদের কখনোই ছিল না।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে হুথিদের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এবং মুসলিম বিশ্বের একচেটিয়া সহানুভূতি অর্জন করতেই সৌদি আরব এই ধরনের বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করছে।
এই হামলা এবং পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই হুথিরা এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে সৌদি আরবের আকাশসীমায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করার হুমকি দিয়েছে। তারা চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে যে, মক্কা ও মদিনা অঞ্চল ব্যতীত সৌদি আরবের অন্য কোনো অঞ্চলে কোনো ধরনের বিমান চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
এই হুমকির রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এই হামলার ফলে বিমানবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দাম্মাম বিমানবন্দরে চালানো এই হামলায় অন্তত দুজন সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিক এবং অন্যজন সৌদি আরবের স্থানীয় বাসিন্দা বলে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বেসামরিক স্থাপনায় এই ধরনের প্রাণঘাতী হামলা আন্তর্জাতিক যুদ্ধরীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, সংঘাতের মাত্রা এখন আর কেবল সামরিক স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং নিরীহ বেসামরিক নাগরিকরাও এর চরম মূল্য চোকাচ্ছে।
স্থলভাগ ও আকাশপথের পাশাপাশি এই সংঘাত এখন সমুদ্রপথেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সম্প্রতি সাগরবক্ষে আরও একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দাবি অনুযায়ী, তারা সাগরে অবস্থানরত একটি ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজে সৌদি আরবের সামরিক জোটের বিমান হামলার পর সেখান থেকে অন্তত ১৪ জন ভারতীয় নাগরিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে।
যদিও এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য এবং স্বাধীনভাবে এর সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবে এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে এই আঞ্চলিক সংঘাতের ধ্বংসাত্মক ঢেউ আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের রুটগুলোতেও প্রবলভাবে আছড়ে পড়ছে।
সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বিদেশী নাগরিকদের জড়িয়ে পড়ার এই ঘটনাগুলো বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সংকট তৈরি করছে, যা সামাল দেওয়া সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দাম্মামে ভারতীয় নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং সাগরে ভারতীয় নাবিকদের উদ্ধারের দাবি-সব মিলিয়ে এই সংঘাতে তৃতীয় কোনো পক্ষের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বহুগুণে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে প্রাপ্ত এই সামগ্রিক তথ্যাবলি থেকে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, ইয়েমেন এবং সৌদি আরবের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সহসাই অবসানের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বরং, নতুন নতুন পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান, অর্থনৈতিক স্থাপনায় সুপরিকল্পিত হামলা এবং পবিত্র শহরগুলোকে কেন্দ্র করে চলমান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এই ভূরাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
উভয় পক্ষ যদি দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে এসে একটি শান্তিপূর্ণ, বাস্তবসম্মত ও টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে না পায়, তবে এই সংঘাত কেবল ইয়েমেন বা সৌদি আরবের জন্যই নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এক বড় ধরনের অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত নিরসনে আরও জোরালো, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।