দেশের অন্যতম প্রধান সামরিক ও কৌশলগত স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সর্বাধিনায়কের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কমন্ডার নাকদি সম্প্রতি তাঁর এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশ্লেষণধর্মী ভাষণে দেশের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে বিশদ আলোকপাত করেছেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, ইরানি জনগণের নিরবচ্ছিন্ন, আপসহীন এবং ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক শত্রুমহলের সমস্ত সুদূরপ্রসারী ও জটিল ষড়যন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে একটি অচলাবস্থায় ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পশ্চিমা বিশ্বের নানামুখী ও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং লাগাতার কূটনৈতিক আগ্রাসনের মুখে ইরানের সাধারণ মানুষের এই অটল ও অবিচল অবস্থান কেবল একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিরই পরিচায়ক নয়, বরং এটি বৈশ্বিক আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি নীরব অথচ অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আবির্ভূত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং প্রখ্যাত ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে চলা এই অবর্ণনীয় চাপের মুখেও ইরানের এই অনমনীয় ও স্বাধীনচেতা মনোভাব সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে প্রতিনিয়ত এক নতুন ও অভাবনীয় আকার প্রদান করে চলেছে।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলোতে সরাসরি সম্প্রচারিত এক বিশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে আইআরজিসির এই শীর্ষস্থানীয় ও বর্ষীয়ান সামরিক কর্মকর্তা দেশের জাতীয় স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় সাধারণ জনগণের অপরিসীম আত্মত্যাগ ও সীমাহীন ধৈর্যের কথা অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, বহির্বিশ্বের ক্রমাগত ও অন্যায্য রাজনৈতিক চাপ এবং বিশেষ করে ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত আগ্রাসী নীতি, আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস ও নানাবিধ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে ইরানের সাধারণ জনগণ যে অভাবনীয় সাহসিকতা, স্থৈর্য ও অসীম বীরত্বের পরিচয় দিয়ে চলেছে, তা সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে কোনো সাধারণ বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।
বরং এই অবিস্মরণীয় প্রতিরোধের শেকড় জাতির মননে ও বিশ্বাসে অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত রয়েছে। তিনি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের এই আপসহীন ও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মূল আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক ভিত্তি হলো পবিত্র ইসলাম ধর্মের মহান আহলে বাইতের শাশ্বত শিক্ষা এবং কারবালার ঐতিহাসিক ও রক্তস্নাত প্রান্তরে হজরত জয়নাবের (সা.) প্রদর্শিত সেই কালজয়ী সাহসিকতা, ধৈর্য ও অতুলনীয় আত্মত্যাগ।
ধর্মীয় এই সুমহান মূল্যবোধ এবং ঐতিহাসিক এই পবিত্র আত্মিক অনুপ্রেরণাই মূলত সমগ্র ইরানি জাতিকে যেকোনো ধরনের অন্যায্য আন্তর্জাতিক চাপ, নিষ্ঠুর অবিচার এবং পাশবিক জুলুমের বিরুদ্ধে কখনো মাথা নত না করে চিরকাল অবিচল ও শিরদাঁড়া উঁচু করে বেঁচে থাকার অসীম সাহস ও অনির্বাণ প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগে যুদ্ধের ধরন ও কৌশল সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক যুদ্ধ এখন কেবল আর সীমান্ত বা রণাঙ্গনের প্রথাগত সমরাস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা এখন অর্থনীতি, সংস্কৃতি, সাইবার জগৎ এবং মনস্তত্ত্বের মতো বিস্তৃত ও অদৃশ্য ময়দানেও সমান্তরালভাবে এবং অত্যন্ত তীব্র গতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
এই নির্মম বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে কমন্ডার নাকদি তাঁর তথ্যবহুল বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক ও বহুমুখী আগ্রাসনের কথা অত্যন্ত বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অভিযোগ করেন যে, পশ্চিমা বিশ্ব গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত সুকৌশলে ও সুপরিকল্পিতভাবে কঠোরতম অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ব্যাপক ও আগ্রাসী সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে ভেতর থেকে দুর্বল, অকার্যকর ও অস্থিতিশীল করার এক নিরন্তর ও ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে।
তাদের এই ষড়যন্ত্রের মূল লক্ষ্যই ছিল দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক দৈন্য ও কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের মনে চরম হতাশা, ক্ষোভ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করা এবং একই সাথে বিষাক্ত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজকে তাদের নিজস্ব গৌরবময় শেকড়, ধর্মীয় অনুশাসন ও হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
কিন্তু শত্রুপক্ষের এই সমস্ত জটিল, সুদূরপ্রসারী ও নিখুঁত হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত ও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, তারা স্বাধীনচেতা ইরানি জনগণের ইস্পাতকঠিন দৃঢ় সংকল্প, দেশপ্রেম এবং একই সাথে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া ক্রমবর্ধমান, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অপ্রতিরোধ্য সামরিক সক্ষমতাকে সঠিকভাবে ও বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানি জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের এক দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। বিগত শতাব্দীর ইসলামি বিপ্লবের একেবারে সূচনালগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি চরম সংকটময় ও অস্তিত্ব রক্ষার সন্ধিক্ষণে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত, নিঃস্বার্থ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের ভৌগোলিক ও আদর্শিক সার্বভৌমত্বকে বারবার নিশ্চিত ও সুরক্ষিত করেছে।
আইআরজিসির এই শীর্ষ জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা তাঁর যুগান্তকারী বক্তব্যে এই ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ওপর বিশেষ ও তীক্ষ্ণ আলোকপাত করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, দশকের পর দশক ধরে চলে আসা পশ্চিমা বিশ্বের ও বিদেশি পরাশক্তিগুলোর এই ধারাবাহিক, একপেশে ও মাত্রাতিরিক্ত চাপ ইরানি জাতিকে একচুল পরিমাণও বিন্দুমাত্র পিছু হটতে বা নিজেদের পরম লালিত আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য করতে পারেনি।
বরং অত্যন্ত বিস্ময়কর ও অভাবনীয়ভাবে এই বহুমুখী ও চতুর্মুখী চাপ জাতির জন্য একটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী, আশীর্বাদপুষ্ট ও অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল বয়ে এনেছে। বিদেশি আগ্রাসন ও অন্যায্য অবরোধের এই তীব্র হুমকির মুখে সমগ্র ইরানি জাতির মধ্যে এক অভূতপূর্ব, স্বতঃস্ফূর্ত ও সর্বব্যাপী জাতীয় সচেতনতা এবং দেশপ্রেমের এক নবজাগরণ ঘটেছে।
সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণ এবং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যে যে পারস্পরিক অগাধ আস্থা, অটুট সংহতি ও ইস্পাতকঠিন ঐক্যের বন্ধন রচিত হয়েছে, তা দেশের পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন আরও অনেক বেশি সুদৃঢ়, মজবুত ও অটুট আকার ধারণ করেছে, যা যেকোনো ধরনের বিদেশি আগ্রাসন বা সামরিক হস্তক্ষেপ সফলভাবে মোকাবিলায় একটি দুর্ভেদ্য ও নিশ্ছিদ্র ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির সাধারণ সমীকরণ অনুযায়ী, যখন কোনো উন্নয়নশীল বা স্বাধীন দেশের ওপর ধারাবাহিকভাবে ও বছরের পর বছর ধরে এমন সর্বগ্রাসী অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন সাধারণত সেই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার এবং রাষ্ট্রটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চরম ও বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ক্ষেত্রে বিশ্ববাসী সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অভাবনীয় এক চিত্র অবলোকন করেছে বলে আইআরজিসির এই শীর্ষ কমন্ডার নাকদি দৃঢ়ভাবে মনে করেন। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে ও গর্বের সাথে বলেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এখন আর নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বহির্বিশ্বের কোনো সাহায্য, অনুদান বা করুণার ওপর বিন্দুমাত্র নির্ভরশীল নয়।
বরং দেশটি এখন সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দেশের ভেতরের বিপুল ও অব্যবহৃত সম্ভাবনা, অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী জনশক্তি এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব দেশীয় প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত ও বিকশিত অত্যাধুনিক, যুগান্তকারী প্রতিরক্ষা শক্তির ওপর নির্ভর করে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং দেশীয় শিল্প, কৃষি ও গবেষণার অভাবনীয় বিকাশের মাধ্যমে ইরান আজ সমগ্র বিশ্বের সামনে এই অকাট্য সত্যটিই অত্যন্ত সফলভাবে প্রমাণ করেছে যে, কোনো ধরনের অন্যায্য অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা বা আন্তর্জাতিক চোখরাঙানিই একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী জাতির চূড়ান্ত অগ্রযাত্রাকে কখনোই চিরতরে স্তব্ধ বা শৃঙ্খলিত করে দিতে পারে না।
পরিশেষে, আইআরজিসির এই জ্যেষ্ঠ ও প্রজ্ঞাবান সামরিক কর্মকর্তার দীর্ঘ ও বিশ্লেষণমূলক বক্তব্য থেকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের নিজস্ব জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, পবিত্র আদর্শিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীন ভৌগোলিক অখণ্ডতা সম্পূর্ণভাবে অক্ষুণ্ণ রেখে যেকোনো ধরনের জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মাত্রার সংকট অত্যন্ত সফলতার সাথে অতিক্রম করার একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব, টেকসই ও অত্যন্ত কার্যকর পথ চিরতরে তৈরি করে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এই চরম জটিল, পরিবর্তনশীল এবং সংঘাতময় এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ইরানের এই অভাবনীয় আত্মনির্ভরশীলতা এবং অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার আপসহীন নীতি কেবল তাদের নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা নয়, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের এবং এর আশপাশের ভূখণ্ডগুলোর ক্ষমতার সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এক অত্যন্ত নীরব কিন্তু নির্ণায়ক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা নিরলসভাবে পালন করে চলেছে।
শত্রুর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বোনা যাবতীয় ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক অবরোধ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধকে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের উন্নতির ও আত্মবিকাশের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে ইরান আজ বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে প্রমাণ করেছে যে, একটি জাগ্রত জাতির সম্মিলিত ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অগাধ দেশপ্রেম এবং অটুট আদর্শিক ঐক্যের কাছে বিশ্বের যেকোনো প্রবল পরাশক্তির আগ্রাসন ও ষড়যন্ত্রই চূড়ান্তভাবে চরম পরাজয় বরণ করতে বাধ্য।