শুক্রবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৬
৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন নেতাদের চেয়ে ভয়ংকর অপরাধী মানব ইতিহাসে আর নেই, ইরানি সেনাবাহিনী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম

মার্কিন নেতাদের চেয়ে ভয়ংকর অপরাধী মানব ইতিহাসে আর নেই, ইরানি সেনাবাহিনী
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বৈরী সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন করে শুরু হয়েছে এক তীব্র বাকযুদ্ধ। আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে একে অপরকে লক্ষ্য করে কঠোর আক্রমণাত্মক মন্তব্য করার ধারাবাহিকতায় এবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে তেহরান।

 

ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও অতীতের নেতাদের মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

 

তাঁর মতে, সভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের মতো এত নির্মম ও নিষ্ঠুর অপরাধী গোষ্ঠী বিশ্ববাসী আর কখনও দেখেনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কড়া প্রতিক্রিয়া মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক মন্তব্যের সরাসরি ও তীক্ষ্ণ জবাব হিসেবেই সামনে এসেছে।

 

সম্প্রতি বৈশ্বিক রাজনীতিতে সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় একটি বিবৃতি প্রদান করেন।

 

তিনি তাঁর মন্তব্যে বলেন, বিশ্ব আজ এমন একটি দেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যারা কোনো ধরনের রাখঢাক ছাড়াই প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে তারা আন্তর্জাতিক পানিসীমায় চলাচলকারী সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়মিত হামলা চালায়।

 

রুবিও আরও যোগ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর থেকে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তরফ থেকে এমন বেপরোয়া, ধ্বংসাত্মক ও চরম হুমকিস্বরূপ আচরণ আর কখনও দেখেনি।

 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং স্বাভাবিকভাবেই তা তেহরানের সর্বোচ্চ মহলে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই গুরুতর অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা এবং সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বার্তা প্রকাশ করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আকরামিনিয়া।

 

তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, ইরান যদি এমন কোনো কাজ করেও থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের উচিত নিজেদের আয়নায় নিজেদের রক্তাক্ত চেহারা দেখা।

 

ইরানি সেনামুখপাত্র অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আজ এমন একটি দেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, যারা একদিকে শান্তির কথা বলে আলোচনার টেবিলে বসে, আবার ঠিক সেই মুহূর্তেই চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়ে নিষিদ্ধ ও ভয়ংকর বোমার ব্যবহার করে নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়।

 

তাঁর বর্ণনায় উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, মার্কিন হামলায় এক নিমেষে ১৬৮ জন নিষ্পাপ শিশু এবং বেশ কয়েকজন সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।

 

জেনারেল আকরামিনিয়ার অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ হয়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনীর অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে তিনি আরও জানান যে, বিদেশের মাটিতে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ১০৪ জন নাবিককে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

 

এর পাশাপাশি, একটি স্বাধীন দেশের সম্পূর্ণ বেসামরিক ও আনন্দঘন পরিবেশের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত নিরীহ অতিথিদের ওপর বোমা বর্ষণ করে তাদের হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধের সাথেও মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি যুক্ত।

 

আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি এবং মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘনের এই অমানবিক উদাহরণগুলো টেনে এনে তিনি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকেই বিশ্বদরবারে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।

 

ইরান বোঝাতে চেয়েছে যে, যারা নিজেরাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিরীহ বেসামরিক মানুষ, শিশু এবং আনন্দোৎসবে মেতে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর নিষিদ্ধ মারণাস্ত্রের প্রয়োগ করে, তাদের মুখে অন্য কোনো স্বাধীন দেশের সমালোচনা একেবারেই বেমানান ও চরম ভণ্ডামি।

 

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই চলমান মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক যুদ্ধ বৈশ্বিক রাজনীতির মঞ্চে কোনো নতুন ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে উভয় দেশই নিজেদের নীতিগত অবস্থানে অনড় থেকে একে অপরের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি প্রক্সি সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে।

 

তবে সামরিক পর্যায়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মুখ থেকে সরাসরি নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রাণহানির পরিসংখ্যান উল্লেখ করে এমন আক্রমণাত্মক বিবৃতি বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে আরও কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

 

বিশেষ করে যখন বিশ্বে একাধিক ফ্রন্টে ভয়াবহ সংঘাত চলছে, তখন পরাশক্তিগুলোর মধ্যে এমন প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ বিশ্বশান্তির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত। ইরান দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে মূলত মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে এবং সম্পদ লুণ্ঠন করছে।

 

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও তার মিত্রদের নিয়ে ইরানকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের প্রধান মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। জেনারেল আকরামিনিয়ার এই বার্তার একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো নিষিদ্ধ অস্ত্রের ব্যবহারের সরাসরি অভিযোগ।

 

আধুনিক যুদ্ধনীতি ও জেনেভা কনভেনশনে রাসায়নিক, জৈবিক বা গুচ্ছবোমার মতো মারণাস্ত্রের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও, ইরানের দাবি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক আগ্রাসনে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি।

 

একইসাথে, আলোচনার টেবিলে বসে একদিকে শান্তির কূটনীতি চালানো এবং অন্যদিকে চরম সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখার যে নির্লজ্জ দ্বৈত নীতির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, তা মূলত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় সমালোচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

ইরান মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনার অর্থ হলো কেবলই সময়ক্ষেপণ এবং কূটনৈতিক কূটচালের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশলমাত্র। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার যে গুরুতর অভিযোগ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উত্থাপন করেছেন, তার পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।

 

লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের জ্বালানিসহ একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয় বলে এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

যুক্তরাষ্ট্র বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান এই আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে সামরিক বাধা সৃষ্টি করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে বরাবরই পশ্চিমা এই অভিযোগ শক্তভাবে অস্বীকার করে বলা হয়েছে যে, তারা কেবল তাদের নিজেদের পানিসীমার সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই প্রয়োজনীয় আইনি ও সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে।

 

উল্টো পশ্চিমা দেশগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত ও অবৈধ সামরিক উপস্থিতিকে এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার মূল কারণ হিসেবে দায়ী করে আসছে তেহরান। ইরানি সেনা মুখপাত্রের বক্তব্যে অত্যন্ত আবেগের সাথে উঠে আসা শিশু হত্যা, সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং বিয়ের আনন্দঘন অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পুরোনো ও অমীমাংসিত উদ্বেগকেই নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।

 

অতীতে বিভিন্ন সময় যুদ্ধকবলিত ও সংঘাতময় অঞ্চলগুলোতে মার্কিন ড্রোন হামলা বা আকস্মিক বিমান হামলায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। জেনারেল আকরামিনিয়া মূলত সেই নির্মম অতীত ও নিষ্ঠুর বর্তমানের দিকেই সরাসরি আঙুল তুলেছেন।

 

তাঁর মতে, একটি সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় নৈতিক ও কৌশলগত পরাজয় ঘটে ঠিক তখনই, যখন তারা যুদ্ধক্ষেত্রে সমকক্ষ শত্রুর বদলে সম্পূর্ণ নিরীহ নারী ও শিশুদের নিজেদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে উল্লাস প্রকাশ করে।

 

আর এই ন্যাক্কারজনক কাজটিতে যুক্তরাষ্ট্র যে চরম পারদর্শিতা দেখিয়েছে, তা বিশ্বের সভ্য ইতিহাসে আর কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই সুদীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক বার্তার একেবারে শেষে ইরানি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশ্বের জাগ্রত বিবেকের কাছে একটি অত্যন্ত জোরালো ও তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন।

 

তিনি সমগ্র মানব ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখার আহ্বান জানিয়ে গভীর আক্ষেপের সাথে প্রশ্ন করেন, প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের যুগে বিশ্বের কোনো প্রান্তের মানুষ কি মার্কিন নেতাদের মতো এমন ভয়ংকর, নিষ্ঠুর এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীদের অস্তিত্ব কখনো দেখেছে?

 

তাঁর এই সমাপনী প্রশ্নটি কেবল একটি সাধারণ জিজ্ঞাসা নয়, বরং এটি সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্যবাদী নীতি, সামরিক আগ্রাসন এবং তাদের স্বঘোষিত মানবাধিকারের বুলি আওড়ানোর বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের আদর্শিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কঠোর বিবৃতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নিকট ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের কোনো দৃশ্যমান উন্নতির সম্ভাবনা নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান বহুমুখী সংকট, বাণিজ্যিক নৌপথের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে উভয় দেশের মধ্যে আদর্শিক ও সামরিক দূরত্ব আরও বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

সামরিক ও কূটনৈতিক উভয় ফ্রন্টেই ইরান যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের অন্যায় চাপের কাছে মাথা নত করবে না, জেনারেল আকরামিনিয়ার এই বক্তব্য বিশ্ববাসীর কাছে তারই একটি স্পষ্ট, জোরালো ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা বহন করে।

 

- পার্সটুডে