দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ৭৭তম জন্মদিন উদযাপনের প্রাক্কালে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাতে জেরুজালেমের ঐতিহ্যবাহী ও ব্যস্ততম মাহানে ইহুদা বাজারের নিকটবর্তী এলাকা দিয়ে যখন সরকারপ্রধানের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িবহর দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে একটি কাঁচের বোতল সরাসরি গাড়িবহর লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এমন আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত হামলার পরও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রোটোকল অনুযায়ী গাড়িবহরটি এক মুহূর্তের জন্যও সেখানে থামেনি।
তবে, রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রহরীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেন। তারা মুহূর্তের মধ্যেই রাস্তার পাশের নিরাপত্তাবেষ্টনী বা ব্যারিকেড ডিঙিয়ে ওই আক্রমণকারীকে শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু করেন।
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এক নজিরবিহীন বিভাজন ও তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তার স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু যখন মাহানে ইহুদা বাজারের মূল অংশে এসে পৌঁছান, তখন সেখানে এক ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়।
ক্ষমতাসীন লিকুদ দলের বিপুল সংখ্যক স্থানীয় সমর্থক আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তারা তাদের শীর্ষ নেতাকে অত্যন্ত উষ্ণ ও সোচ্চার অভ্যর্থনা জানান। তবে এই সাময়িক উৎসবমুখর পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরম রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রকৃত চিত্রটি ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তেল আবিবের আরেকটি স্থানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল।
জেরুজালেমে পৌঁছানোর আগে প্রধানমন্ত্রী যখন তেল আবিবের সুপরিচিত হাতিকভা বাজার পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, তখন তাকে সাধারণ নাগরিকদের একাংশের তীব্র ও প্রত্যক্ষ ক্ষোভের সম্মুখীন হতে হয়। সেখানে উপস্থিত সাধারণ জনগণের মাঝে সরকারবিরোধী এক চাপা উত্তেজনা দীর্ঘকাল ধরেই বিরাজমান ছিল, যা প্রধানমন্ত্রীর সশরীরে উপস্থিতিতে প্রকাশ্য ও আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করে।
তেল আবিবের ওই বাজারে সফররত অবস্থায় এক অভাবনীয় ও উত্তেজনাকর দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। সেখানে উপস্থিত এক ক্ষুব্ধ নাগরিক সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে অতীতের কিছু বিতর্কিত রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের বিষয়ে অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
বিশেষ করে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে অর্থায়নের যে গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘকাল ধরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচিত হয়ে আসছে, সেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে ওই ব্যক্তি জনসম্মুখে সরাসরি কৈফিয়ত দাবি করেন।
তিনি যখন তার মুঠোফোনের মাধ্যমে এই পুরো বাদানুবাদের দৃশ্যটি ধারণ করার চেষ্টা করেন, তখন পরিস্থিতি অত্যন্ত দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানে উপস্থিত ক্ষমতাসীন দলের উগ্র সমর্থকেরা বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রতিবাদী ব্যক্তির ওপর চড়াও হন।
তারা চরম বলপ্রয়োগ করে তার হাত থেকে মুঠোফোনটি কেড়ে নিয়ে মাটিতে ফেলে দেন এবং তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও ধাক্কাধাক্কি করেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ইসরায়েলের বর্তমান সমাজকাঠামোতে বিরাজমান রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার এক চরম ও উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হিসেবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক, আবেগঘন ও শক্তিশালী প্রতিবাদটি এসেছে মূলত গত বছরের ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ হামলায় নিহত এবং এখনও জিম্মি থাকা ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে।
সেই অভিশপ্ত দিনের ভয়াবহতা, ধ্বংসযজ্ঞ ও চরম গোয়েন্দা ব্যর্থতার গ্লানি ইসরায়েলের সমাজজীবনে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, এই প্রতিবাদ যেন তারই এক জীবন্ত ও জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। তেল আবিবের ওই প্রতিবাদ সমাবেশে এমন বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখ উপস্থিত ছিলেন, যাদের স্বজনেরা সেই হামলায় চরম মূল্য চুকিয়েছেন।
নিহত জিম্মি গায় ইলুজের শোকসন্তপ্ত পিতা মিশেল ইলুজ, এখনো বন্দি থাকা কারমেল গেটের নিকটাত্মীয় গিল দিকমান এবং মাতান জাঙ্গাউকারের ব্যথাতুর মাতা আইনাব জাঙ্গাউকার সেখানে সশরীরে উপস্থিত থেকে এক হৃদয়স্পর্শী ও বেদনাবিধুর পরিবেশের সৃষ্টি করেন।
তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী নন, বরং তারা এমন কিছু অসহায় মানুষ যারা তাদের প্রিয়জনদের হারানোর সীমাহীন বেদনায় প্রতিনিয়ত দগ্ধ হচ্ছেন। এই স্বজনেরা অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে ৭ অক্টোবরের সেই নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়ভার নির্দ্বিধায় নিজ কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান।
একইসঙ্গে তারা রাষ্ট্র পরিচালনার চরম ব্যর্থতার দায়ে তাকে অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে পদত্যাগের জোর দাবি জানান। তবে, নিজেদের সন্তানদের জীবিত বা মৃত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার দাবিতে এবং রাষ্ট্রের ব্যর্থতার জবাবদিহিতা চেয়ে রাজপথে নামা এই অসহায় পরিবারের সদস্যদের সাথে যে নির্মম ও অমানবিক আচরণ করা হয়েছে, তা গোটা বিশ্বকে হতবাক করেছে।
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী মাতান জাঙ্গাউকারের মা আইনাব জাঙ্গাউকার অত্যন্ত ভারী কণ্ঠে ও অশ্রুসিক্ত নয়নে গণমাধ্যমের কাছে তার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বিস্তারিত জানান যে, ক্ষমতাসীন দলের উগ্র সমর্থকেরা তাদের মতো শোকাহত পরিবারের সদস্যদের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি বা মানবিকতা প্রদর্শন তো করেইনি, বরং তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেছে।
তাদের গায়ে প্রকাশ্যে থুথু নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং বাজারের দোকান থেকে কাঁচা শাকসবজি তুলে তাদের দিকে অত্যন্ত অবমাননাকরভাবে ছুঁড়ে মারা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন রাষ্ট্রে সাধারণ নাগরিকদের, বিশেষ করে সন্তান হারানো মায়েদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জবাবে এমন হিংস্র, অমানবিক ও পাশবিক আচরণ সত্যিই অভাবনীয়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠার এবং বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কায় একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অর্থাৎ পুলিশ সেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। তারা নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে এই শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের ওই স্থান থেকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেয়, যা সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
জিম্মি অবস্থায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করা তরুণ গায় ইলুজের পিতা মিশেল ইলুজ এই পুরো ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিষয়ে তার তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি কেবল তার এবং অন্যান্য স্বজনদের ওপর হওয়া শারীরিক ও মানসিক হামলারই তীব্র নিন্দা জানাননি, বরং দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থার নৈতিক অবক্ষয়ের দিকেও স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের সামনে দেওয়া এক আবেগঘন ও যৌক্তিক বিবৃতিতে তিনি ইসরায়েলের সকল সাধারণ নাগরিকের প্রতি এক উদাত্ত ও সময়োপযোগী আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে এবং জাতীয় নিরাপত্তার এমন ভঙ্গুর দশায় নাগরিকদের উচিত আগামী জাতীয় নির্বাচনে অত্যন্ত সচেতনভাবে ও বিচার-বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
তার মতে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখন নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং উল্টো শোকাহত ও প্রতিবাদী মানুষের ন্যায়সঙ্গত কণ্ঠস্বর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রোধ করার চেষ্টা করছে, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ব্যালটের মাধ্যমে তাদের উচিত জবাব দেওয়ার সময় চলে এসেছে।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ৭৭তম জন্মদিন উদযাপনের এই যাত্রাটি কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সফর ছিল না। বরং এই ঘটনাটি বর্তমান ইসরায়েলি সমাজের অভ্যন্তরে প্রোথিত গভীর বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা এবং সুদীর্ঘ যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ সামাজিক ট্রমার এক নিখুঁত ও বাস্তব প্রতিচ্ছবি হিসেবেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
যখন একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতার গাড়িবহরে খোদ নিজ দেশের সাধারণ নাগরিকেরা প্রকাশ্যে হামলা চালায় এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোকে রাজপথে লাঞ্ছিত হতে হয়, তখন তা সেই রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর এক গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মতে, এই ঘটনা ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক অন্ধকার অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামী নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।