শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদের খতিবকে ইসরায়েলি বাহিনীর আটক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

জুমার নামাজের পর আল-আকসা মসজিদের খতিবকে ইসরায়েলি বাহিনীর আটক
ছবি : Collected

পবিত্র নগরী জেরুজালেমের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মুসলমানদের প্রথম কেবলা এবং তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ফের গভীর উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে।

 

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, পবিত্র জুমার নামাজ এবং খুতবা প্রদানের ঠিক পরপরই আল-আকসা মসজিদের সম্মানিত খতিব শেখ খালেদ আবু জুমআকে আকস্মিকভাবে আটক করেছে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী।

 

ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ওয়াফা (WAFA) এবং জেরুজালেম গভর্নরেটের গণমাধ্যম শাখার সর্বশেষ প্রতিবেদন ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, জুমার নামাজের মতো একটি বিশাল ও সংবেদনশীল ধর্মীয় জমায়েত শেষ হওয়ার মুহূর্তেই এই আটকের ঘটনা ঘটে।

 

এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি মুসল্লিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ভীতির সঞ্চার করেছে। তবে ঠিক কী কারণে, কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বা আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তাকে জনসমক্ষে আটক করা হলো, সে বিষয়ে ইসরায়েলি পুলিশ বা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়নি।

 

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, অন্যান্য শুক্রবারের মতোই এদিনও পবিত্র জুমার নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মুসল্লি আল-আকসা মসজিদে একত্রিত হয়েছিলেন। ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং অসংখ্য চেকপয়েন্ট পার হয়ে মুসল্লিরা এই ধর্মীয় কর্তব্যে অংশ নেন।

 

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও শান্তির আবহে জুমার নামাজ ও খুতবা পরিচালনা করেন খতিব শেখ খালেদ আবু জুমআ। খুতবায় ধর্মীয় অনুশাসন, ফিলিস্তিনিদের সামাজিক সম্প্রীতি এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা সংগ্রাম ও সংকট উত্তরণের দিকনির্দেশনা উঠে আসে।

 

কিন্তু নামাজ শেষে যখন মুসল্লিরা মসজিদ প্রাঙ্গণ ত্যাগ করতে শুরু করেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য আকস্মিকভাবে খতিবকে চারপাশ থেকে ঘেরাও করে ফেলে। কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা বা স্পষ্ট আইনি পরোয়ানা প্রদর্শন ছাড়াই তাকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে জোরপূর্বক নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায় তারা।

 

প্রত্যক্ষদর্শীরা সংবাদমাধ্যমকে জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত সম্পন্ন হয় যে উপস্থিত হাজার হাজার মুসল্লি কার্যত হতবাক হয়ে যান। পবিত্র একটি ধর্মীয় স্থান থেকে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ধর্মীয় নেতাকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হেনেছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, আল-আকসা মসজিদের মতো একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ধর্মীয় স্থানে এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েলি প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনী ফিলিস্তিনি মুসল্লি, ধর্মীয় নেতা এবং আল-আকসা মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ইসলামিক ওয়াকফ কর্মকর্তাদের ওপর নানামুখী চাপ, কঠোর নজরদারি ও বিধিনিষেধ আরোপ করে আসছে।

 

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ইসরায়েল সুকৌশলে আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক 'স্ট্যাটাস কো' বা স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক এই স্থিতাবস্থা অনুযায়ী, মসজিদ প্রাঙ্গণের সার্বিক দেখভাল ও প্রশাসনিক দায়িত্ব জর্ডানের ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত থাকার কথা এবং সেখানে কেবল মুসলমানদেরই স্বাধীনভাবে ইবাদত করার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

 

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় যে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর ছত্রছায়ায় চরমপন্থী বসতিস্থাপনকারীরা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এর প্রতিবাদ করলে বা মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের পক্ষ থেকে অধিকার আদায়ের স্বপক্ষে জোরালো বক্তব্য এলেই তাদের ওপর নেমে আসে দমন-পীড়ন।

 

শেখ খালেদ আবু জুমআর আটকের ঘটনাটিকেও ফিলিস্তিনি জনগণ সেই দীর্ঘস্থায়ী ও পদ্ধতিগত নিপীড়নেরই একটি অংশ হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আল-আকসা মসজিদ এবং এর আশপাশের পরিস্থিতি সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।

 

এই পবিত্র মসজিদের অভ্যন্তরে ঘটা যেকোনো উত্তেজনা মুহূর্তের মধ্যে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ছাড়িয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের দাবানল উসকে দিতে পারে। অতীতে আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করার যেকোনো অপপ্রয়াসকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে।

 

তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো বারবার ইসরায়েলকে আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

 

তা সত্ত্বেও, শুক্রবারের এই আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিশ্বনেতাদের যৌক্তিক আহ্বানের প্রতি তোয়াক্কা করছে না। একজন ধর্মীয় নেতাকে তার ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পরপরই আটক করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এবং জেনেভা কনভেনশনে স্বীকৃত 'ধর্মীয় স্বাধীনতার' সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলি বাহিনীর এমন পদক্ষেপের পেছনে ফিলিস্তিনিদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার একটি প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য নিহিত থাকতে পারে। আল-আকসা মসজিদের খতিব বা ওয়াকফ কর্মকর্তারা ফিলিস্তিনি সমাজের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও দিকনির্দেশক ব্যক্তিত্ব।

 

তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই এই ধরনের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতাদের কণ্ঠস্বর রোধ করতে পারলে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ স্পৃহাকে অবদমিত করা যাবে বলে ইসরায়েলি প্রশাসন মনে করতে পারে।

 

তাছাড়া, বিনা বিচারে বা সম্পূর্ণ অস্পষ্ট অভিযোগে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা ইসরায়েলের একটি বিতর্কিত কৌশল, যা 'অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন' বা প্রশাসনিক আটক হিসেবে পরিচিত।

 

এই নিবর্তনমূলক আইনের আওতায় ইসরায়েল যেকোনো ফিলিস্তিনিকে বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মাসের পর মাস কারাগারে বন্দি রাখতে পারে। শেখ খালেদ আবু জুমআকেও একই নির্মম ভাগ্য বরণ করতে হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

 

বর্তমানে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং বারুদের স্তূপের মতো বিরাজ করছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং পরবর্তীতে এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করে নেয়।

 

তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলের এই একতরফা দাবিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। ফিলিস্তিনি জনগণ পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিবেচনা করে। এই জটিল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পবিত্র আল-আকসা মসজিদ।

 

ফিলিস্তিনিদের জন্য আল-আকসা কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি তাদের জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় চেতনার সর্বোচ্চ প্রতীক। তাই এই মসজিদের ওপর বা এর ধর্মীয় নেতাদের ওপর যেকোনো রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে ফিলিস্তিনিরা সমগ্র জাতির ওপর আঘাত হিসেবেই বিবেচনা করে।

 

খতিব শেখ খালেদ আবু জুমআকে আটকের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর জেরুজালেমের পুরনো শহরের অলিগলিতে এক ধরনের থমথমে ও ভীতিকর নীরবতা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় সাধারণ ক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে প্রতিবাদের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এবং সেই বিক্ষোভ দমাতে ইসরায়েলি বাহিনী আবারও কঠোর বলপ্রয়োগ করতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন।

 

সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত ইসরায়েলি পুলিশ প্রশাসন বা গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে শেখ খালেদ আবু জুমআর বর্তমান অবস্থা বা তাকে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে ন্যূনতম কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তথ্যের এই অস্বচ্ছতা ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি খতিবের পরিবারের সদস্যদের উৎকণ্ঠাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ফিলিস্তিনি অধিকার গোষ্ঠী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবিলম্বে খতিব শেখ খালেদ আবু জুমআর দ্রুত ও নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানিয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংবেদনশীল বিষয়ে জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছে।

 

তারা জোরালোভাবে বলছে যে, আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক পবিত্রতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে বিশ্বনেতাদের কেবল মৌখিক নিন্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ইসরায়েলের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায়, এই পবিত্র ভূমিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে এবং প্রতিদিন নতুন নতুন আটকের ঘটনার মধ্য দিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তালিকা কেবল দীর্ঘ হতে থাকবে।

 

- ওয়াফা নিউজ এজেন্সি