শুক্রবার তুরস্কের ঐতিহাসিক ও অন্যতম বৃহৎ শহর ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক বৈঠকে মিলিত হওয়ার পর সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান এবং মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন মধ্যপ্রাচ্যের নানামুখী সংকট সমাধানে কার্যকর পথ খুঁজছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই চার দেশের সম্মিলিত বিবৃতি বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নতুন ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তার জন্ম দিয়েছে।
এই দেশগুলোর মতে, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারিত্ব এবং তাদের ধারাবাহিক সম্প্রসারণবাদী ও আগ্রাসী নীতি।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠকে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ-পরিস্থিতি, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান মানবিক বিপর্যয় এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে তারা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব কেবল ফিলিস্তিনিদের মৌলিক মানবাধিকারই হরণ করছে না, বরং এটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে একটি অস্থিতিশীল, সংঘাতপূর্ণ ও অনিরাপদ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
এই বেআইনি দখলদারিত্বের কারণেই ওই অঞ্চলে বারবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছে, যা ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চরম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক পরাশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সামরিক শক্তি পাকিস্তানের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বিশাল নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।
প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারি নীতিমালা ও দমন-পীড়নমূলক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করা হয়। সেখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়, “বিশ্বজুড়ে যেসব অন্যায় হচ্ছে, সেগুলো আরও বাড়িয়ে তুলছে ইসরায়েলের সরকারি নীতি।”
এই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে চার দেশের প্রতিনিধিরা মূলত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তারা বিশ্ববাসীর সামনে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, ইসরায়েল যেভাবে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সনদগুলোকে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘন করে চলেছে, তা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের স্বৈরতান্ত্রিক ও আগ্রাসী শক্তিগুলোকেও মানবাধিকার লঙ্ঘনে উৎসাহিত করছে।
এর ফলে বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির যে কাঠামো রয়েছে, তা ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক প্রাণঘাতী আগ্রাসন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন এবং সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার বলপ্রয়োগের মতো ঘটনাগুলো যে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, তা এই বিবৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আবারও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ফিলিস্তিন সংকটের একটি স্থায়ী, ন্যায়সঙ্গত ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের রূপরেখাও এই ঐতিহাসিক যৌথ বিবৃতিতে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দেশ চারটি তাদের অভিন্ন ও অটল অবস্থানে জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায় হলো একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও ভৌগোলিকভাবে অবিচ্ছিন্ন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন।
আর এই রাষ্ট্র গঠন করতে হবে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আগের সীমানার ভিত্তিতে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে অবিভক্ত পূর্ব জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক ও আইনি দাবির প্রতিও তারা তাদের পূর্ণ এবং অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং ঐতিহাসিক পূর্ব জেরুজালেম জবরদখল করে নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং রাষ্ট্রসংঘ কখনোই ইসরায়েলের এই জবরদখলকে আইনি বৈধতা দেয়নি। তাই এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আবারও সেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমানার রূপরেখায় ফিরে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, যা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্মগত ও দীর্ঘদিনের ন্যায্য অধিকার।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এই চতুর্দেশীয় বৈঠক এবং এর ফলশ্রুতিতে দেওয়া যৌথ বিবৃতি বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। কারণ, সৌদি আরব এবং মিসর দীর্ঘদিন ধরেই আরব বিশ্বের রাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে।
অন্যদিকে, তুরস্ক তার অনন্য ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বে তাদের একটি অত্যন্ত জোরালো ও গ্রহণযোগ্য কণ্ঠস্বর রয়েছে।
এর পাশাপাশি, পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সবসময় ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে সোচ্চার থেকেছে। এই চার দেশের এক কূটনৈতিক মঞ্চে সমবেত হওয়া এবং একই সুরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা প্রদান প্রমাণ করে যে, ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক ঐক্যের একটি নতুন ও শক্তিশালী মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে, যা পশ্চিমা বিশ্বকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে।
বিবৃতিতে আরও জোরালো ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইসরায়েল যতদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে তাদের বেআইনি দখলদারিত্বের সম্পূর্ণ অবসান না ঘটাবে এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত না করবে, ততদিন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে কোনো ধরনের টেকসই শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা একেবারেই অসম্ভব।
শুধু তাই নয়, ফিলিস্তিনিদের তাদের পূর্বপুরুষের নিজস্ব বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে জোরপূর্বক অবৈধ ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের যে অমানবিক ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া ইসরায়েল চালিয়ে যাচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সমতুল্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই অবৈধ ও অমানবিক প্রক্রিয়ার কারণে ফিলিস্তিনিরা প্রতিনিয়ত তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আদি আবাসস্থল হারাচ্ছে, যা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম চরম মানবিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে।
পরিশেষে, এই যৌথ বিবৃতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রতি একটি অত্যন্ত প্রচ্ছন্ন ও কঠোর বার্তা বহন করে। নিরাপত্তা পরিষদসহ বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতি এখানে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান এই কাঠামোগত নিপীড়নের ক্ষেত্রে আর নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন না করে।
ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী ও দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য বিশ্বনেতাদের অতি দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তুরস্কের মাটিতে দাঁড়িয়ে চার দেশের এই সম্মিলিত ও বলিষ্ঠ উচ্চারণ বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে এবং আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব এই যৌথ বিবৃতির পর তাদের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কোনো দৃশ্যমান, বস্তুনিষ্ঠ ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে কি না। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের চিরস্থায়ী অবসানের যে যৌক্তিক দাবি এই ইস্তাম্বুল বৈঠক থেকে বিশ্বমঞ্চে উঠে এসেছে, তা আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়েই থাকবে।