সম্প্রতি তিনি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী ছবি প্রকাশ করে বিশ্বমঞ্চে এক প্রচ্ছন্ন কিন্তু অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছবি প্রকাশের মাধ্যমে মূলত ইরানে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য সামরিক হামলার পরিণতি যে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য কতটা ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে, সেই চরম হুঁশিয়ারিই দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলোর প্রতি এটি একটি সুস্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সমীকরণকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের একটি বিশেষ প্রতিবেদন এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-এর সম্প্রচারিত খবরের বরাতে জানা যায়, মেজর জেনারেল মোহেব্বির প্রকাশিত ওই ছবিটিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ছবির পটভূমিতে অত্যন্ত সুকৌশলে হরমুজ প্রণালির নীল জলরাশিতে একটি বিশালাকার তেলবাহী ট্যাংকারে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলার দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এই প্রতীকী ও লোমহর্ষক উপস্থাপনার মাধ্যমে ইরান মূলত পশ্চিমা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো হঠকারী সামরিক পদক্ষেপ বা ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসী যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ধস এবং আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সামাল দেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর জন্য কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সাধারণ সামুদ্রিক জলপথ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধানতম ধমনী এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই সরু প্রণালি দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বলয় দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সাধারণ জনগণের ওপর যে বহুমুখী, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তারই একটি কৌশলগত ও উপযুক্ত জবাব হিসেবে ইরান এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
মূলত পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে তেহরান বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের এই অন্যতম প্রধান রুটটিকে আংশিকভাবে বন্ধ রেখে এর ওপর নিজেদের কঠোর ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক দাবি অনুযায়ী, বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তাদের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারকে এই স্পর্শকাতর প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। পারস্য উপসাগরীয় এই অঞ্চলে নৌচলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বেশ কিছু নতুন এবং কঠোর নিয়মকানুন বেঁধে দিয়েছে।
তেহরানের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি হলো, যদি কোনো দেশ বা নির্দিষ্ট কোনো জাহাজ তাদের নির্ধারিত এই সামুদ্রিক আইন বা নিয়মকানুন বিন্দুমাত্র অমান্য করার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক এবং কঠোর সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ব্যবস্থার আওতায় সংশ্লিষ্ট জাহাজে সরাসরি হামলা চালানোর মতো চরম পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইরানের এই আপসহীন ও কঠোর অবস্থানের কারণে ওই অঞ্চলে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক নৌযান ও শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে একধরনের তীব্র আতঙ্ক এবং ভয়াবহ অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক এই জটিল সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র ইসরায়েল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আখ্যান বা চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের পক্ষ থেকে ইরানের এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের দাবিকে সরাসরি এবং অত্যন্ত জোরালো ভাষায় নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বা পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করার মতো পর্যাপ্ত সামরিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সক্ষমতা ইরানের আদৌ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে চাইছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিরাপদ রাখতে তারা বদ্ধপরিকর এবং তেহরান এই কৌশলগত জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
তাদের মতে, ইরানের এই ধরনের বক্তব্য কেবলই মনস্তাত্ত্বিক ফায়দা লোটার এবং বৈশ্বিক বাজারে কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি করার একটি অপচেষ্টা মাত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই পাল্টাদাবির জবাবে ইরানও নিজেদের সামরিক ও ভূ-কৌশলগত অবস্থানে সম্পূর্ণ অনড় ও অবিচল রয়েছে।
তেহরানের সামরিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো, তাদের দাবির সপক্ষে পর্যাপ্ত এবং অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, যা পশ্চিমা প্রোপাগান্ডাকে সহজেই ভুল প্রমাণ করে। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আকাশচিত্র, স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত অত্যাধুনিক চিত্রাবলি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এই কৌশলগত জলপথের ওপর বর্তমানে দেশটির পূর্ণ ও নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইরানের শক্তিশালী সামরিক রাডার এবং নৌবাহিনীর দ্রুতগামী টহল বোটগুলো সার্বক্ষণিকভাবে প্রণালির প্রতিটি ইঞ্চি জায়গার ওপর কড়া নজরদারি বজায় রেখেছে এবং যেকোনো বিদেশি অনুপ্রবেশ বা বেআইনি নৌচলাচল রুখে দিতে তারা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান এবং পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যকার এই পাল্টাপাল্টি দাবি ও সামরিক মহড়া বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত বহন করছে।
যদি সত্যিই এই প্রণালিতে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সূত্রপাত হয় বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো সামুদ্রিক অবরোধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম যে কেবল ১১৬ ডলারে গিয়ে ঠেকবে তা নয়, বরং তা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে।
এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি যে একটি দীর্ঘস্থায়ী মন্দা ও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও চরম হুমকির মুখে ফেলে দেবে।
একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। পরিশেষে, আইআরজিসি মুখপাত্র মেজর জেনারেল হোসেইন মোহেব্বির এই প্রতীকী ছবি প্রকাশ কেবল একটি সাধারণ সামরিক বা কূটনৈতিক বিবৃতি নয়; এটি আগামী দিনের বৈশ্বিক রাজনীতির একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস।
ইরান এই জোরালো বার্তার মাধ্যমে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা নিজেদের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধাগুলো সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করে পশ্চিমা দেশগুলোর যেকোনো আগ্রাসনের চরম মূল্য আদায় করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
এখন দেখার বিষয়, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই প্রচ্ছন্ন হুমকির বিপরীতে কীভাবে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ঘুঁটি সাজায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে কতটা কার্যকরী ও বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়।
কারণ হরমুজ প্রণালির নীল জলে যে কোনো মুহূর্তে সামরিক সংঘাতের যে লাল আগুন জ্বলে ওঠার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকেই নয়, পুরো বিশ্বকেই এক ভয়াবহ ও অকল্পনীয় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে অমোঘ গতিতে ঠেলে দিতে পারে।