বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে নতুন করে শুরু হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভ ও গণজাগরণের প্রেক্ষাপটে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকরা নিজেদের অপরাধ আড়াল করার জন্য অত্যন্ত সুকৌশলে সাধারণ জনগণের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করছে।
এই মিথ্যা বিভাজনের ফাঁদে পা দিয়ে সাধারণ মানুষ যেন নিজেদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে না যায়, সে বিষয়ে তিনি বিশ্ববাসীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা সিমা নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী বার্তায় তিনি বিশ্ব রাজনীতির পর্দার আড়ালের এই অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেন। মোহাম্মদ বাকের কলিবফ তাঁর লিখিত বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ যখন তাদের ন্যায্য অধিকার, বৈশ্বিক শান্তি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে জোরালো প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তখন ক্ষমতালোভী শাসকদের মূল চক্রান্তই হলো এই প্রতিবাদের অভিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়া।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ও যুদ্ধবাজ শাসকরা কখনোই চায় না যে জনগণের ক্ষোভ সরাসরি তাদের দিকে বা তাদের তৈরি করা অমানবিক রাষ্ট্রযন্ত্রের দিকে ধাবিত হোক। এ কারণে তারা সুপরিকল্পিতভাবে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে জনগণ নিজেদের অধিকার আদায়ের লড়াই ভুলে গিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত হয়।
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘অনুভূমিক সংঘাত’ বা সাধারণ মানুষের নিজেদের মধ্যকার লড়াই বলা হয়ে থাকে, শাসকরা মূলত সেই পরিস্থিতিই উসকে দেয়। এর ফলে প্রতিবাদের যে মূল লক্ষ্য-অর্থাৎ দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকদের পতন বা তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা-তা সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও হতাশাজনক বিষয় হলো, জনগণকে নিজেদের মধ্যে লড়িয়ে দেওয়ার পর এই ধুরন্ধর শাসকরা পুনরায় সেই সাধারণ জনগণকেই অস্থিতিশীলতার জন্য দোষারোপ করে এবং তাদের নানাভাবে ভর্ৎসনা করে নিজেদের গায়ে নৈতিকতার চাদর জড়িয়ে নেয়।
বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার উদাহরণ টেনে ইরানের এই শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা বলেন, বৈশ্বিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা অভিজাত শ্রেণি বিশ্বজুড়ে সমস্ত অন্যায়, অপরাধ এবং কাঠামোগত দুর্নীতির নাটের গুরু।
তিনি তাঁর বার্তায় সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অত্যন্ত আলোচিত প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তোলপাড় ফেলে দেওয়া কুখ্যাত এপস্টিন মামলার ফাঁস হওয়া গোপন তথ্য, যেখানে বিশ্বের বহু ক্ষমতাধর ও অভিজাত ব্যক্তির অকল্পনীয় নৈতিক স্খলন ও জঘন্য অপরাধের চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দখলদার বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও বর্বরোচিত মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এর পাশাপাশি, স্বাধীনচেতা রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের মিত্রদের অব্যাহত আগ্রাসন, অর্থনৈতিক অবরোধ ও প্রকাশ্য যুদ্ধংদেহী আচরণের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
কলিবফের মতে, এই প্রতিটি ঘটনার পেছনে দৃশ্যত ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট মনে হলেও, এগুলোর শেকড় গভীরভাবে একই জায়গায় প্রোথিত। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া এবং মানবতা লঙ্ঘনের এই প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে বিশ্বের ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করা সেই একই যুদ্ধবাজ ও দুর্নীতিগ্রস্ত গোষ্ঠী, যারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য পুরো বিশ্বকে জিম্মি করে রেখেছে।
জনগণের মনোযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য শাসকরা যে মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে, তার একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সমসাময়িক উদাহরণও তুলে ধরেন মোহাম্মদ বাকের কলিবফ।
তিনি জানান, ক্ষমতালোভী শাসকরা মূল সমস্যা ও নিজেদের সীমাহীন দুর্নীতি থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার জন্য সমাজে ‘অভিবাসী বনাম স্থানীয় জনগণ’-এর মতো সম্পূর্ণ কৃত্রিম ও ভিত্তিহীন সংঘাত তৈরি করে।
উন্নত বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও আজ এই একই চিত্র দৃশ্যমান। অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব বা মুদ্রাস্ফীতির মতো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতাগুলোর দায়ভার শাসকরা অত্যন্ত সুকৌশলে নিরীহ অভিবাসীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।
এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ তাদের দুর্দশার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র বা দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের দায়ী করার বদলে অভিবাসীদের নিজেদের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে শুরু করে। সমাজের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের মধ্যে এই ধরনের বিভেদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত হয়, তখন পর্দার আড়ালে বসে সেই একই অভিজাত গোষ্ঠী নিশ্চিন্তে তাদের লুণ্ঠন ও দুর্নীতির রাজত্ব চালিয়ে যায়।
স্পিকার কলিবফ বিশ্ববাসীকে এই অত্যন্ত বিপজ্জনক ও সুপরিকল্পিত ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের বার্তার শেষাংশে স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি একটি অত্যন্ত জোরালো ও দূরদর্শী সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, বিষয়বস্তু পরিবর্তন করে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এই যুদ্ধবাজ শাসকরা যেন কোনোভাবেই নিজেদের জবাবদিহি ও আন্তর্জাতিক বিচারের কাঠগড়া থেকে রেহাই পেতে না পারে, সে বিষয়ে বিশ্বের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে অতন্দ্র প্রহরীর মতো সতর্ক থাকতে হবে।
প্রতিবাদের ভাষা ও লক্ষ্যকে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত হতে দেওয়া যাবে না। সাধারণ মানুষের প্রকৃত শত্রু কোনো নিরীহ অভিবাসী বা ভিন্ন মতাবলম্বী সাধারণ নাগরিক নয়; বরং তাদের প্রকৃত শত্রু হলো সেই সমস্ত যুদ্ধবাজ শাসক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিবাজরা, যারা নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করছে।
তাই চলমান বৈশ্বিক বিক্ষোভগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও সঠিক লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের এই শীর্ষ নেতার এমন সুস্পষ্ট ও বিশ্লেষণধর্মী বার্তা বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতাকামী ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রতিবাদী চেতনাকে নতুন করে শাণিত করবে এবং বৈশ্বিক শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত প্রতিরোধের পথ প্রশস্ত করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।