আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। লোহিত সাগরের অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য, পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে চলমান দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ এবং এর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে আকস্মিক তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা-সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
এই বহুমুখী ও জটিল সংকটের কারণে বিনিয়োগকারী এবং আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, যার অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সর্বশেষ প্রকাশিত বাজার বিশ্লেষণ ও তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান দুই বেঞ্চমার্ক বা সূচক-ব্রেন্ট ক্রুড এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয়ের দামেই বিশাল উল্লম্ফন লক্ষ করা গেছে।
শুক্রবার লেনদেন শেষে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড বিক্রি হয়েছে ১১৬ দশমিক ৭২ মার্কিন ডলারে। এর আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের তুলনায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫৫ ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে, শতকরা হিসেবে যা প্রায় ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।
একই দিনে মার্কিন বাজার আদর্শ ডব্লিউটিআইয়ের দামেও বড় ধরনের উত্থান দেখা যায়। শুক্রবার প্রতি ব্যারেল ডব্লিউটিআই বিক্রি হয়েছে ১০৩ দশমিক ২৭ ডলারে। আগের দিনের তুলনায় এই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৮০ ডলার বা শতকরা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।
সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সামগ্রিকভাবে ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক ও আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে ইয়েমেনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু, খনিজ সম্পদ উত্তোলন কেন্দ্র এবং তেল শোধনাগারগুলোকে কেন্দ্র করে হুথি বিদ্রোহীরা ধারাবাহিক ও সমন্বিত হামলা চালিয়ে আসছে।
সৌদি আরবের মতো একটি দেশের বিশাল জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর এই ধরনের প্রত্যক্ষ ও ধারাবাহিক আক্রমণ বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোতে যেকোনো ধরনের সামরিক আঘাত বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক আতঙ্ক তৈরি করে, যাকে অর্থনীতি বিজ্ঞানের ভাষায় 'জিওপলিটিক্যাল রিস্ক প্রিমিয়াম' বা ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মূল্য বলা হয়।
হুথিদের এই অব্যাহত হামলার কারণে সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার যে জোরালো আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, মূলত তার ওপর ভর করেই তেলের বাজার এতটা ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করছে।
এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি হিসেবে পরিচিত লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বেশি ভঙ্গুর ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য এবং বিশেষ করে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই সামুদ্রিক রুটটি অপরিহার্য। এই প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। সেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য ও আক্রমণের আশঙ্কার কারণে বিশ্বের বড় বড় তেলবাহী ট্যাংকার ও জাহাজ পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
অনাকাঙ্ক্ষিত হামলা এড়াতে অনেক শিপিং কোম্পানি বাধ্য হয়ে বিকল্প এবং দীর্ঘতর নৌপথ ব্যবহার করছে, যার ফলে পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটছে। এই লজিস্টিক্যাল বা সরবরাহগত সংকট শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের চূড়ান্ত দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
লোহিত সাগরের এই চলমান সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার খ্যাত হরমুজ প্রণালিতে বিদ্যমান দীর্ঘস্থায়ী অবরোধ। বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থা বিরাজ করায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি কার্যত অকার্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো থেকে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারগুলোতে তেল পৌঁছানোর এই প্রধান পথটি অবরুদ্ধ থাকায় বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পাশাপাশি এক ধরনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়েছে।
আমদানিকারক দেশগুলো ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সন্দিহান হয়ে আগাম তেল কিনে মজুত করার মরিয়া চেষ্টা করছে, যা তেলের দামের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে ঘৃতাহুতির মতো কাজ করছে। ভূ-রাজনৈতিক এই সামরিক ও কৌশলগত সংকটের মধ্যেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবেশগত ও পরিকাঠামোগত বিপর্যয়।
সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকার থেকে সমুদ্রে বিপুল পরিমাণ তেল ছড়িয়ে পড়ার এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আরব আমিরাতে এমন একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক পরিবেশের বিশাল ক্ষতির পাশাপাশি তেল সরবরাহ কাঠামোর নিরাপত্তার দুর্বলতাকেও আন্তর্জাতিক মহলের সামনে উন্মোচিত করেছে।
এই পরিবেশগত দুর্ঘটনার কারণে সাময়িকভাবে হলেও ওই অঞ্চলের তেল পরিবহন, পরিশোধন ও লোডিং কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। এমনিতেই যুদ্ধ, হামলা ও অবরোধের কারণে বৈশ্বিক বাজার যখন অত্যন্ত নাজুক ও সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে, তখন আরব আমিরাতের মতো একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল সরবরাহকারীর দিক থেকে আসা এমন নেতিবাচক খবর বাজারে ঝুঁকির মাত্রাকে আরও কয়েক গুণ ঘনীভূত করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামের এমন রুদ্ধশ্বাস চিত্র এর আগে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল।
সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সামরিক অভিযান চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছিল, যার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল।
সেই চরম অস্থিতিশীল ও যুদ্ধাবস্থার পরিস্থিতিতেও তেলের দাম আজকের মতোই আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছিল। বিশ্লেষকরা গভীরভাবে মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি হয়তো সরাসরি পরাশক্তিগুলোর মধ্যে কোনো যুদ্ধ নয়, কিন্তু হুথিদের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর লাগামহীন তৎপরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর চরম অবনতি মূলত এপ্রিল মাসের সেই ভীতিকর পরিস্থিতিরই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।
জ্বালানি তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজার ও বৈশ্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে। তেলের দাম বাড়ার প্রত্যক্ষ ও তাৎক্ষণিক সুবিধা ভোগ করছে জ্বালানি খাতের বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো।
রয়টার্সের তথ্যমতে, তেলের মূল্যবৃদ্ধির জেরে শুক্রবার নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটে জ্বালানি খাতের শেয়ারের সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা জ্বালানি কোম্পানিগুলোতে বিপুল মুনাফার আশায় প্রচুর অর্থ লগ্নি করছেন।
তবে মুদ্রার অপর পিঠে, জ্বালানির এই উচ্চমূল্য বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে চরম মাত্রায় উসকে দেওয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান শেয়ার সূচকগুলো ব্যাপক দরপতনের মধ্য দিয়ে দিন শেষ করেছে।
উৎপাদনমুখী শিল্প, পরিবহন ও এভিয়েশন খাতের কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা হতাশায় ব্যাপক হারে শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন, যা শেয়ারবাজারে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই জ্বালানি পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এই দেশগুলোর অর্থনীতি মূলত আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। তেলের দাম ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, এসব দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যয়, কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন এবং শিল্প কারখানার পরিচালন ব্যয় জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে।
এর ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর মূল্যস্ফীতির এক বিশাল বোঝা চেপে বসবে, যা দেশগুলোর সামষ্টিক অর্থনীতিকে চরম সংকটের মুখে ফেলবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার কমানোর বা স্থিতিশীল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বিশ্ববাজারে তেলের এই অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লম্ফন তাদের সমস্ত অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিচ্ছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান বহুমুখী সংকট কেবল ওই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অশনিসংকেত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্মিলিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে হুথিদের আক্রমণ বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলোতে অবাধ ও নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা। তা না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।