শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যাত্রীদের জীবন রক্ষায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করলেন অকুতোভয় কর্মী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম

যাত্রীদের জীবন রক্ষায় নিজের প্রাণ উৎসর্গ করলেন অকুতোভয় কর্মী
ছবি : Collected

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ যখন ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, ঠিক সেই মুহূর্তে মানবিকতা ও সাহসিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সৌদি আরবের এক সাধারণ বিমানবন্দর কর্মী। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে শত শত যাত্রীর প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন সুলতান আল-কাহতানি নামের এই বীর।

 

সৌদি আরবের দাম্মাম শহরে অবস্থিত কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সম্প্রতি ইয়েমেনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের এক অতর্কিত হামলার সময় এই মর্মান্তিক ও একইসঙ্গে বীরত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১ অক্টোবর বিমানবন্দরে হুথিদের নিক্ষিপ্ত প্রজেক্টাইল বা ড্রোনের আঘাতে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

 

সেই ভয়াবহ আগুন থেকে সাধারণ যাত্রী এবং রানওয়েতে থাকা বিমানগুলোকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি যে আত্মত্যাগের নিদর্শন রেখেছেন, তা আজ গোটা সৌদি আরব এবং আন্তর্জাতিক মহলে গভীর শ্রদ্ধা ও প্রশংসার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে।

 

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত ২১ অক্টোবর কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক কার্যক্রম চলছিল। যাত্রীদের ভিড় এবং কোলাহলে মুখর ছিল বিমানবন্দরের প্রস্থান তোরণ বা ডিপার্চার লাউঞ্জ সংলগ্ন এলাকা।

 

ঠিক সেই সময়েই ইয়েমেনের দিক থেকে আসা হুথি বিদ্রোহীদের একটি আকস্মিক হামলায় বিমানবন্দরের ওই নির্দিষ্ট এলাকায় তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা এবং কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।

 

আতঙ্কে সাধারণ যাত্রীরা যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণভয়ে ছুটোছুটি করছিলেন, তখন সুলতান আল-কাহতানি এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মী নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার বদলে এক অভাবনীয় সাহসিকতার পরিচয় দেন।

 

রানওয়েতে অপেক্ষমাণ অন্যান্য যাত্রীবাহী বিমান এবং টার্মিনালে থাকা শত শত মানুষের জীবন ও সম্পদ যেন আগুনের গ্রাসে পরিণত না হয়, সেই চিন্তায় তাঁরা নিজেদের জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র হাতে সরাসরি আগুনের কুণ্ডলীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

 

পেশাগত দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের এক বিরল মেলবন্ধন দেখা যায় সুলতান আল-কাহতানির পদক্ষেপে। তিনি জানতেন এই আগুন যেকোনো মুহূর্তে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে এবং এর ফলে শত শত নিরীহ প্রাণ নিমিষেই ঝরে যেতে পারে।

 

তাই এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁদের এই তাৎক্ষণিক এবং সাহসী পদক্ষেপের কারণেই মূলত আগুন রানওয়ে বা অন্যান্য স্পর্শকাতর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারেনি।

 

কিন্তু এই মহৎ কাজ করতে গিয়ে সুলতান নিজেকে আর রক্ষা করতে পারেননি। বদ্ধ পরিবেশে আগুনের ভয়াবহতা এবং চারপাশের বিষাক্ত কালো ধোঁয়া তাঁর শ্বাসযন্ত্রে মারাত্মকভাবে প্রবেশ করে। দীর্ঘক্ষণ ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশে অগ্নিনির্বাপণের কাজ করার কারণে তিনি অতিরিক্ত ধোঁয়ায় আক্রান্ত হন। একপর্যায়ে তাঁর বুকে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয় এবং তিনি তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকেন।

 

সহকর্মীরা এবং উদ্ধারকারী দল তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে বিমানবন্দরের জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং পরবর্তীতে একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, কিন্তু অতিরিক্ত বিষাক্ত ধোঁয়া তাঁর ফুসফুস এবং শ্বাসযন্ত্রকে এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

 

চিকিৎসকদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই অকুতোভয় বীর। তাঁর এই অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে হাসপাতাল চত্বরে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যিনি কিছুক্ষণ আগেও অন্যদের জীবন বাঁচাতে নিজের সবটুকু শক্তি উজাড় করে দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই আজ না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন।

 

পারিবারিক জীবনে নিহত সুলতান আল-কাহতানি ছিলেন ছয় সন্তানের এক স্নেহময় পিতা। তাঁর এই মৃত্যুতে পরিবারটিতে যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তা কোনো সান্ত্বনার ভাষাতেই দূর করার মতো নয়। তবে পুত্র হারানোর এই বুকফাটা বেদনার মাঝেও সুলতানের বৃদ্ধ পিতা যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তা গোটা জাতির বিবেককে নাড়া দিয়েছে।

 

ছেলের এই মহৎ আত্মত্যাগ নিয়ে গর্ববোধ করে তাঁর বাবা গণমাধ্যমকে বলেন, সুলতান নিজের দেশ এবং দেশের সাধারণ মানুষের সেবা করতেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। একজন পিতা হিসেবে ছেলের মৃত্যুতে তাঁর হৃদয় রক্তাক্ত হলেও, ছেলে যে চরম সাহসিকতা এবং মানবিকতার পরিচয় দিয়ে শত শত মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে, সেই গৌরবে তিনি আজ গভীরভাবে গর্বিত।

 

দেশের তরে এই আত্মত্যাগ তাঁর পরিবারের জন্য এক চিরস্থায়ী সম্মানের কারণ হয়ে থাকবে বলে তিনি মনে করেন। সুলতান আল-কাহতানির এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই গোটা সৌদি আরবজুড়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে হাজার হাজার মানুষ শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছেন। নাগরিকরা বলছেন, যুদ্ধের ময়দানে নয়, বরং এক সাধারণ কর্মক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও যে মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সাহসিকতার এমন চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, সুলতান তা প্রমাণ করে গেছেন।

 

চরম ঝুঁকির মুখে অন্য যাত্রীদের রক্ষা করার এই সাহসিকতার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবেও তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান জানানোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্বারা সৌদি আরবের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার যে ভয়াবহতা, তা আবারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

 

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতে প্রায়শই বেসামরিক বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং আবাসিক এলাকাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সৌদি আরবের অন্যতম বৃহৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি বিমানবন্দর, যেখান থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। এমন একটি বেসামরিক স্থাপনায় হামলা কেবল সৌদি আরবের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্যও এক মারাত্মক হুমকি।

 

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সুলতান আল-কাহতানির মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের এক করুণ ও মানবিক মূল্য। ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে যখন নিরীহ মানুষ এবং বেসামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তখন সুলতানের মতো সাধারণ কর্মীদের ওপরই এর সবচেয়ে বড় আঘাত এসে পড়ে।

 

নিজের জীবনের বিনিময়ে তিনি হয়তো অনেকগুলো পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, কিন্তু তাঁর নিজের ছয়টি শিশু আজ চিরতরে পিতৃহারা হলো। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি বিশ্বনেতাদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সংঘাত এবং যুদ্ধের দামামায় সাধারণ মানুষের জীবনের যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এর একটি স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত জরুরি।

 

পরিশেষে, সুলতান আল-কাহতানির নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় বড় কোনো সেনাপতি বা রাষ্ট্রনেতার মতো লেখা থাকবে না, কিন্তু মানবতার ইতিহাসে তাঁর এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

যখন চারপাশে আতঙ্ক এবং মৃত্যুর পদধ্বনি, তখন নিজের জীবনের পরোয়া না করে অন্যের জীবন বাঁচানোর যে তাগিদ তিনি অনুভব করেছিলেন, তা মানবতার এক শাশ্বত রূপ। দাম্মাম বিমানবন্দরের এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের শিখিয়ে গেল যে, সত্যিকারের বীরত্ব কোনো পদবি বা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে মানুষের প্রতি মানুষের অগাধ ভালোবাসা এবং চরম মুহূর্তে নিঃস্বার্থভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহসিকতার ওপর। সুলতান আল-কাহতানি তাঁর জীবন দিয়ে সেই অমোঘ সত্যটিই প্রমাণ করে গেলেন।

 

- গালফ নিউজ