শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬
৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গণমাধ্যমে প্রচারণার উদ্দেশ্যেই ইরানকে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি, দাবি আইআরজিসির

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম

গণমাধ্যমে প্রচারণার উদ্দেশ্যেই ইরানকে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি, দাবি আইআরজিসির
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতা ও স্নায়ুযুদ্ধ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে যে নতুন করে সামরিক সংঘাতের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, তাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং কেবলই গণমাধ্যমে প্রচারণার একটি সস্তা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ইরান।

 

দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সুসংগঠিত সামরিক শাখা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনের এই ধরনের ফাঁকা হুমকির মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করা।

 

একই সঙ্গে তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই কোনো ধরনের হঠকারী সামরিক সংঘাতের সূচনা করার দুঃসাহস দেখায়, তবে তার এক দাঁতভাঙা ও ভয়াবহ জবাব দিতে তেহরান সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ইরানের আধা-সরকারি ও অত্যন্ত পরিচিত সংবাদমাধ্যম ‘ফার্স নিউজ এজেন্সি’-কে দেওয়া এক বিশেষ এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক যুদ্ধংদেহী বাগাড়ম্বরের তীব্র সমালোচনা করে এই মন্তব্য করেন।

 

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি তাঁর সাক্ষাৎকারে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে, বর্তমানের জটিল ও সংবেদনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কার্যকর বা সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।

 

আইআরজিসির এই শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করেন, শত্রুপক্ষ অর্থাৎ ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারক ও সামরিক কৌশলবিদরা অন্য যে কারও চেয়ে এই নির্মম সত্যটি অনেক বেশি ভালো করেই জানেন।

 

পেন্টাগনের সামরিক কর্তারা খুব ভালোভাবেই অবগত আছেন যে, তেহরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তা মার্কিন বাহিনীর জন্য একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে পরিণত হবে এবং তারা নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে নিশ্চিতভাবেই চরম ব্যর্থতার সম্মুখীন হবে।

 

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক বাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের শক্তিশালী নেটওয়ার্কের কারণে দেশটিকে সামরিকভাবে পরাজিত করা প্রায় অসম্ভব বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার দম্ভোক্তি করে বলেছেন যে, তিনি চাইলে যেকোনো সময় নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের সঙ্গে চলমান দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান ঘটাতে পারেন।

 

এমনকি তিনি প্রকাশ্যে এমন ঘোষণাও দিয়েছেন যে, ইরানে সম্ভাব্য নতুন ও সরাসরি হামলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আগামী ৩ নভেম্বরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরেই গ্রহণ করা হবে।

 

ট্রাম্পের এই ধরনের লাগামহীন ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি মুখপাত্র জানান, যুদ্ধসংক্রান্ত মার্কিন প্রশাসনের এই ধারাবাহিক বিবৃতিগুলোর পেছনে কোনো বাস্তব সামরিক ভিত্তি নেই।

 

মোহেব্বির মতে, এই ধরনের মনগড়া ও উসকানিমূলক বিবৃতির প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এসব বিষয় ফলাও করে প্রচার করা এবং এর মাধ্যমে ইরানের স্বাধীনচেতা সাধারণ নাগরিকদের মনে এক ধরনের কৃত্রিম ভীতি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।

 

এটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধেরই একটি ধ্রুপদী কৌশল, যেখানে বিনা যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালানো হয়। সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি তেহরানের অনড় ও আপসহীন অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

 

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অতীতের সমস্ত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে পুনরায় ইরানের পবিত্র ভূখণ্ড বা তাদের কোনো কৌশলগত স্বার্থের ওপর সামরিক হামলা চালানোর মতো চরম ভুল করে, তবে ইরান চুপ করে বসে থাকবে না।

 

আইআরজিসির এই মুখপাত্র কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মার্কিন বাহিনী যদি অত্যন্ত সীমিত পরিসরে বা ছোট আকারের কোনো ঝটিকা সামরিক পদক্ষেপও গ্রহণ করে, তবুও ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও অত্যাধুনিক কার্যপরিকল্পনার কারণে তেহরানের পাল্টা জবাব হবে কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী, বিধ্বংসী এবং অপ্রত্যাশিত।

 

ইরানের এই ‘বহুগুণ শক্তিশালী’ জবাব দেওয়ার সক্ষমতা মূলত তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নৌ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধরনের পরস্পরবিরোধী ও আক্রমণাত্মক আচরণের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি গভীর সমীকরণ লুকিয়ে রয়েছে।

 

আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মূলত তার রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী ভোটারদের সন্তুষ্ট করার জন্যই ইরানের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান প্রদর্শনের অভিনয় করছেন।

 

একদিকে তিনি নিজেকে একজন বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠাকারী নেতা হিসেবে জাহির করতে চাইছেন; এর আগে তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি বিশ্বের আটটি বড় ধরনের যুদ্ধ থামিয়েছেন এবং এর জন্য তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্য ছিল, যদিও তিনি তা পাননি। অথচ অন্যদিকে, সেই একই নেতা আবার একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিনাপ্ররোচনায় নতুন করে সামরিক আগ্রাসন চালানোর প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছেন।

 

তাঁর এই দ্বিমুখী ও অস্থিতিশীল পররাষ্ট্রনীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও এক চরম হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যেকোনো ধরনের ছোট সামরিক স্ফুলিঙ্গ মুহূর্তের মধ্যে একটি সর্বাত্মক ও ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে আশঙ্কা করছেন যে, যদি সত্যিই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো ধরনের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়, তবে তা কেবল দুই দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে না।

 

এই সংঘাতের দাবানল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। হরমুজ প্রণালির মতো বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়, তা সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ও অকল্পনীয় ধস নামার শঙ্কা রয়েছে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অন্যান্য পরাশক্তিগুলো এই দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্য বারবার কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে।

 

পরিশেষে, আইআরজিসির মুখপাত্রের এই দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী সাক্ষাৎকারটি মূলত পশ্চিমাদের প্রতি ইরানের একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুকৌশলী কূটনৈতিক এবং সামরিক বার্তা। তেহরান বিশ্ববাসীকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, তারা কোনোভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ বা সামরিক হুমকির কাছে মাথা নত করবে না।

 

একই সঙ্গে তারা এটিও প্রমাণ করতে চাইছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আস্ফালন কেবলই তার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি দুর্বল ও সস্তা হাতিয়ার মাত্র। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সতর্ক দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে।

 

ওই নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপরই মূলত নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শান্তির গতিপ্রকৃতি। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয় এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা একটি ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

 

- সিবিএস নিউজ