শনিবার, জানুয়ারী ২৪, ২০২৬
১১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৫, ০৯:২৭ এএম

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান
ছবি: Al Jazeera

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের দমন অভিযান অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ, জেনিন ও রামাল্লা অঞ্চলে নতুন করে অভিযান চালিয়ে ছয় ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, এই পদক্ষেপগুলো ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের জীবনযাত্রাকে আরও সংকুচিত করেছে, যা ওই অঞ্চলে চলমান উত্তেজনার পারদকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

 

শনিবার ভোরের দিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জেনিন গভর্নরেটের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইয়াবাদ এবং কাবাতিয়া শহরে একযোগে অভিযান চালায়। ওয়াফার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়াবাদ শহরে অভিযান চালিয়ে দুই সহোদরসহ মোট তিনজনকে আটক করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেনারা ভারী সাঁজোয়া যান নিয়ে শহরে প্রবেশ করে এবং বেশ কয়েকটি বাড়িতে তল্লাশি চালায়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি সৃষ্টি করে।

 

একই সময়ে, কাবাতিয়া শহরেও অনুরূপ অভিযান পরিচালিত হয়। সেখান থেকে তিন ফিলিস্তিনি ভাইকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রায়শই এই ধরনের রাত্রিকালীন অভিযানকে "সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম" হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে। তবে ফিলিস্তিনি মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য বিচারবহির্ভূত আটক এবং ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।

 

জেনিন অঞ্চলটি, বিশেষ করে ইয়াবাদ ও কাবাতিয়া, গত দুই বছর ধরেই ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই, গত অক্টোবরের শেষের দিকে, জেনিনের নিকটবর্তী কুদ্দ গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে তিন ফিলিস্তিনি তরুণ নিহত হন। এর আগে ১৬ অক্টোবর কাবাতিয়া শহরেও ইসরায়েলি গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও কাবাতিয়া শহরে ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ও পানি সরবরাহ লাইন ধ্বংস করার ঘটনা ঘটেছিল। এই ধারাবাহিক অভিযানের সর্বশেষ সংযোজন হলো এই ছয়জনকে আটক করার ঘটনা।

 

জেনিন অঞ্চলের উত্তেজনার পাশাপাশি, ইসরায়েলি বাহিনী মধ্য পশ্চিম তীরের রামাল্লা অঞ্চলেও ফিলিস্তিনিদের চলাচলের ওপর নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনারা রামাল্লার কাছে তুরমুস আয়া শহরে একটি নতুন সামরিক চেকপোস্ট স্থাপন করেছে। এই চেকপোস্টটি শহর এবং আশেপাশের গ্রামগুলোর মধ্যে যাতায়াতের প্রধান পথটিকে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলেছে, যার ফলে শিক্ষার্থী, কর্মী এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

 

আরও আশঙ্কাজনকভাবে, ইসরায়েলি বাহিনী আল-মুগাইয়ের গ্রামের পশ্চিম প্রবেশদ্বারটিও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে। আল-মুগাইয়ের এবং পার্শ্ববর্তী তুরমুস আয়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী এবং সামরিক বাহিনীর সমন্বিত সহিংসতার শিকার হয়ে আসছে। এই পদক্ষেপকে স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা "সম্মিলিত শাস্তি" হিসেবে দেখছেন।

 

উল্লেখ্য, গত আগস্ট মাসেই এই আল-মুগাইয়ের গ্রামটি ভয়াবহ অবরোধ এবং সহিংসতার শিকার হয়েছিল। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর কথিত বন্দুক হামলার প্রতিক্রিয়ায়, ইসরায়েলি বাহিনী গ্রামটির সমস্ত প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দিয়ে টানা তিন দিন অবরোধ করে রাখে। সে সময়কার প্রতিবেদনে দেখা যায়, গ্রামে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল, হাজার হাজার জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা হয় এবং ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়। নতুন করে গ্রামের প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া সেই আগস্টের বিভীষিকাময় স্মৃতিকেই ফিরিয়ে এনেছে, যা প্রমাণ করে যে এই অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে।

 

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মতে, এই ধরনের পদক্ষেপগুলো কেবল নিরাপত্তাহীনতাই বাড়ায় না, বরং এটি দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকেও পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং বসতি স্থাপনকারীদের কার্যক্রম আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অবৈধ বলে বিবেচিত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই তৎপরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

বিশেষ করে, ২০২৫ সালের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর বাইডেন প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে সহিংসতার মাত্রা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। একই সাথে, ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে পশ্চিম তীরের অংশবিশেষকে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের অধীনে আনার জন্য উত্থাপিত বিলগুলো ফিলিস্তিনিদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

 

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু রয়েছে। একই সময়ে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, গাজায় যুদ্ধবিরতি চললেও, পশ্চিম তীর একটি নীরব যুদ্ধের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিনকার অভিযান, ভূমি দখল এবং চলাচলে বিধিনিষেধ ফিলিস্তিনিদের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে।

 

এই সর্বশেষ অভিযান এবং বিধিনিষেধ সেই বৃহত্তর চিত্রের অংশ, যা অধিকৃত অঞ্চলে একটি স্থায়ী সংঘাতের পটভূমি তৈরি করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এবং ইসরায়েলের প্রতি জবাবদিহিতার অভাবই এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণে তেল আবিবকে উৎসাহিত করছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির আশাকে সুদূরপরাহত করে তুলছে।

 

- Al Jazeera News