গত জুন মাসে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সরাসরি সামরিক সংঘাতের পর এই প্রথম তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় ফেরার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক এবং ইতিবাচক ইঙ্গিত মিলল, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনে নিযুক্ত ইরানের প্রথম নারী মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি রবিবার এসএনএনটিভি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, "ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে কিছু বার্তা পেয়েছে।" তবে এই বার্তার বিষয়বস্তু, এর প্রকৃতি বা কোন পক্ষ থেকে এই বার্তাগুলি এসেছে, সে সম্পর্কে তিনি কোনো বিশদ বিবরণ দেননি। তিনি কেবল উল্লেখ করেন, "একটি উপযুক্ত সময়ে এই বার্তাগুলির প্রকৃতি এবং বিষয়বস্তব্যের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করা হবে।"
মুখপাত্রের এই সংক্ষিপ্ত এবং সতর্ক মন্তব্যটুকুই গত প্রায় পাঁচ মাসের গভীর কূটনৈতিক অন্ধকার ভেদ করে আসা প্রথম আলোর রেখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বার্তা এমন এক জটিল সময়ে এলো, যখন মাত্র একদিন আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং জুন মাসের হামলার পুনরাবৃত্তি হলে ইসরায়েলকে ‘ভয়াবহ’ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
ইরানের এই আলোচনায় ফেরার ইঙ্গিতকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে গত জুন মাসের ভয়াবহ ঘটনাবলীর দিকে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনের সাথে ইরানের পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনার একটি ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির নেতৃত্বে পাঁচ দফা পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিতও হয়। কিন্তু সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এক আকস্মিক ও বিধ্বংসী সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়।
গত ১৩ জুন, ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীকে লক্ষ্য করে এক সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু করে, যা পরবর্তীতে ‘১২ দিনের যুদ্ধ’ নামে পরিচিতি পায়। এই অভিযানে ইরানের একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা, বিজ্ঞানী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই সংঘাত চরম আকার ধারণ করে যখন ২২ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই আক্রমণে যোগ দেয় এবং ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক কেন্দ্রগুলিতে আঘাত হানে।
ইরানও এই হামলার জবাবে বসে থাকেনি। তারা কাতারে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত আল উদেদ বিমান ঘাঁটিতে পালটা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই নজিরবিহীন পাল্টাপাল্টি আক্রমণে পুরো মধ্যপ্রাচ্য একটি সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। অবশেষে, ২৪ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যা প্রত্যক্ষ সংঘাতের অবসান ঘটালেও কূটনৈতিক পথটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
জুন মাসের সেই যুদ্ধের পর থেকে পারমাণবিক আলোচনা কেবল বন্ধই হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরান আরও বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বরে, ইউরোপীয় ত্রয়ী (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি)-যারা একসময় ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির (জেসিপিওএ) পক্ষে ছিল-তারাও জাতিসংঘের ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থা সক্রিয় করে। এর ফলে ইরানের ওপর জাতিসংঘের সেইসব পুরোনো নিষেধাজ্ঞাগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনঃস্থাপিত হয়, যা পারমাণবিক চুক্তির আওতায় তুলে নেওয়া হয়েছিল। যদিও রাশিয়া এবং চীন এই ‘স্ন্যাপব্যাক’ পদক্ষেপকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে, যা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গভীর বিভাজন স্পষ্ট করে তোলে।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই বিষয়ে দ্বিমুখী নীতি প্রদর্শন করে। একদিকে, ট্রাম্প দাবি করেন যে, জুন মাসের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি "সম্পূর্ণরূপে এবং পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন" হয়ে গেছে। অন্যদিকে, গত অক্টোবরে তিনি এই ইঙ্গিতও দেন যে, একটি "বৃহত্তর আঞ্চলিক চুক্তির" জন্য আলোচনার দরজা খোলা থাকতে পারে।
এই মিশ্র বার্তার মধ্যেই তেহরান তার কঠোর অবস্থান বজায় রাখে। মাত্র শনিবার (১ নভেম্বর), ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, "ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা যাবে না" এবং "যা যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করা যায়নি, তা রাজনীতির মাধ্যমেও পাওয়া যাবে না।" তবে সেই সাক্ষাৎকারেও তিনি একটি ক্ষীণ দরজা খোলা রেখেছিলেন, যখন তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সাথে সরাসরি আলোচনা সম্ভব না হলেও "পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব।"
এই উত্তপ্ত এবং পরস্পরবিরোধী বাগযুদ্ধের পটভূমিতেই মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানির আজকের বক্তব্যটি সামনে এলো। যদিও তিনি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো প্রায় নিশ্চিত যে এই বার্তাগুলি এসেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে এবং এর বাহক হিসেবে কাজ করেছে ওমানের সালতানাত। ওমান ঐতিহ্যগতভাবেই তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে এবং জুন মাসে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পরও মাস্কাট উভয় পক্ষকে আলোচনায় ফিরতে প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
বাগদাদভিত্তিক কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও দাবি করা হয়েছে, ওমানের মাধ্যমে পাঠানো মার্কিন বার্তায় "আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি" এবং একটি "নতুন চুক্তি" সম্পাদনের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনটা হতে পারে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন-জুন মাসে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের পর—এখন একটি কূটনৈতিক ‘জয়’ অর্জনের চেষ্টা করছে। তারা হয়তো এমন একটি ‘নতুন ও উন্নততর চুক্তি’ করতে চাইছে, যা কেবল পারমাণবিক কর্মসূচী নয়, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক প্রভাবকেও অন্তর্ভুক্ত করবে-যা ছিল ২০১৮ সালে মূল চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ।
অন্যদিকে, ইরানের জন্যও এই আলোচনায় ফেরা একটি জটিল হিসাবের অংশ। জুন মাসের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও (যা প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ‘পুনর্গঠনের’ অঙ্গীকার করেছেন) এবং মার্কিন ঘাঁটিতে পালটা হামলা চালিয়ে কিছুটা ‘মর্যাদা’ রক্ষা করার পর, তেহরান হয়তো এখন একটি নতুন অবস্থান থেকে আলোচনা করতে চাইছে। বিশেষ করে যখন দেশটির ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে পরিচিত নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসন ক্ষমতায় এবং ফাতেমেহ মোহাজেরানির মতো একজন নারীকে মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অপেক্ষাকৃত নমনীয় ভাবমূর্তি প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হতে পারে।
ইরানের মুখপাত্র আলোচনায় ফেরার বার্তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, এটি একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ পথের সূচনা মাত্র। সামনের বাধাগুলো এখনো আগের মতোই বিশাল, বরং জুনের যুদ্ধের পর তা আরও জটিল হয়েছে।
মূল বিরোধের বিষয়গুলি অপরিবর্তিত রয়েছে: ১. ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি যেখানে এটিকে ‘অ-আলোচনাযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের মাটিতে যেকোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার (‘শূন্য সমৃদ্ধকরণ’) পুরোনো দাবিতে ফিরে যেতে পারে। ২. ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি: ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আত্মরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করে এবং এটি নিয়ে কোনো আলোচনায় বসতে বরাবরই নারাজ। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো নতুন চুক্তিতে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচীকে অন্তর্ভুক্ত করতে বদ্ধপরিকর।
৩. আঞ্চলিক প্রভাব: হিজবুল্লাহ, হামাস এবং অন্যান্য মিত্রদের প্রতি ইরানের সমর্থন ওয়াশিংটন এবং তার আঞ্চলিক মিত্রদের (বিশেষ করে ইসরায়েল) জন্য প্রধান উদ্বেগের কারণ। ৪. আস্থার সংকট: ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এরপর ২০২৫ সালের জুনে তারা সরাসরি ইরানের মাটিতে হামলা চালিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা তেহরানের জন্য প্রায় অসম্ভব। ইরান যেকোনো নতুন চুক্তিতে কঠোর গ্যারান্টি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বাস্তবায়ন চাইবে।
এই আলোচনায় ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াও একটি বড় নিয়ামক হবে। জুন মাসে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার পর, তেল আবিব কোনোভাবেই চাইবে না যে ইরান সামান্যতম ছাড়ও আদায় করুক। ইউরোপীয় দেশগুলো একটি কূটনৈতিক সমাধান চাইলেও, ‘স্ন্যাপব্যাক’ চালু করার পর তাদের প্রভাব সীমিত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন এই প্রক্রিয়াকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বলয়কে দুর্বল করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখবে।
উপসংহারে বলা যায়, ফাতেমেহ মোহাজেরানির এই সংক্ষিপ্ত ঘোষণাটি একটি গভীর হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এটি নিশ্চিত করল যে, জুনের ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের পরও পর্দার আড়ালে যোগাযোগের চ্যানেলগুলো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে এই ‘বার্তা’গুলো কি শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকে সরাসরি যুদ্ধের ক্ষত শুকিয়ে একটি নতুন চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে পারবে, নাকি এটিও হবে জটিল ভূ-রাজনীতির আরও একটি ব্যর্থ অধ্যায়-তা দেখার জন্য বিশ্বকে এখন চরম উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হবে।