সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫
১ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

তুরস্ক সফর শেষে লেবাননের পথে পোপ লিও, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বার্তা ও সংহতির আহ্বান

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ নভেম্বর, ২০২৫, ০৪:৪৯ পিএম

তুরস্ক সফর শেষে লেবাননের পথে পোপ লিও, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বার্তা ও সংহতির আহ্বান
ছবি: AP

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ সফর শেষে পোপ লিও চতুর্দশ রোববার লেবাননের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। দীর্ঘ সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত লেবাননের মানুষের জন্য তিনি নিয়ে যাচ্ছেন এক গভীর আশার বার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে অস্তিত্বের সংকটে থাকা খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মনোবল বৃদ্ধি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদার করাই তার এই সফরের মূল লক্ষ্য।

 

বৈরুতে রওয়ানা হওয়ার আগে ইস্তাম্বুলে পোপ লিও দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টলিক ক্যাথেড্রালে বিশেষ প্রার্থনায় যোগ দেন এবং বিশ্বব্যাপী অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের আধ্যাত্মিক নেতা একুমেনিকাল প্যাট্রিয়ার্ক বার্থলোমিউয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আর্মেনিয়ান ক্যাথেড্রালে ধূপের ধোঁয়া আর সমবেত সঙ্গীতের মাঝে পোপ ইতিহাসে আর্মেনিয়ান জনগণের সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

তবে তুর্কি মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি অত্যন্ত কূটনৈতিক ও সংযত ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা পোপ ফ্রান্সিসের সময়কার রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। ২০১৯ সালের অর্থনৈতিক ধস, মুদ্রার মান তলানিতে ঠেকে যাওয়া এবং ২০২০ সালে বৈরুত বন্দরের ভয়াবহ বিস্ফোরণ দেশটির জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।

 

ভ্যাটিকানের কাছে লেবানন বরাবরই একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে, যাকে পোপ জন পল দ্বিতীয় ‘ভ্রাতৃত্ব ও সহাবস্থানের বার্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। পোপ ফ্রান্সিসের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা পূরণ করতেই পোপ লিও এই সফরে যাচ্ছেন। তার এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো হতাশায় নিমজ্জিত লেবাননবাসীকে, বিশেষ করে দেশত্যাগে ইচ্ছুক তরুণদের পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো এবং তাদের আশ্বস্ত করা যে বিশ্ব তাদের ভুলে যায়নি।

 

পোপের এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলা দীর্ঘ সংঘাতের রেশ এখনো কাটেনি। গাজা যুদ্ধের প্রভাবে লেবানন সীমান্তে যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, তা গত সেপ্টেম্বরে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বর্তমানে একটি যুদ্ধবিরতি চললেও সাধারণ মানুষের মনে সর্বাত্মক যুদ্ধের আতঙ্ক বিরাজ করছে।

 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ পোপের এই সফরকে স্বাগত জানিয়ে তাদের সমর্থকদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, পোপ লিও তার সফরের শেষ দিনে বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন করবেন এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে একান্তে সময় কাটাবেন। লেবাননের সাধারণ জনগণ আশা করছে, পোপ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের কাছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি তুলবেন, কারণ সত্য ও ন্যায়বিচার ছাড়া প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

 

প্রতিবেশী সিরিয়ার খ্রিস্টানরাও পোপের এই সফরকে ঘিরে নতুন আশার আলো দেখছেন। সিরিয়ায় দীর্ঘ ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সংখ্যালঘু খ্রিস্টানরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। পোপের সান্নিধ্য পেতে এবং তার কাছ থেকে সান্ত্বনার বাণী শুনতে প্রায় ৩০০ সিরিয় খ্রিস্টানের একটি প্রতিনিধি দল লেবাননে পৌঁছেছে।

 

তাদের প্রত্যাশা, এই সফর মধ্যপ্রাচ্যের বিপন্ন জনগনের মনে সাহস জোগাবে এবং সহাবস্থানের পথ সুগম করবে। সব মিলিয়ে, পোপ লিও চতুর্দশের এই সফর কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে শান্তি ও মানবতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি বলিষ্ঠ প্রয়াস।

 

- Euro News