২০১০ সালে ইরানের নৌবহরে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘ ১৬ বছর পর, জামারান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে তেহরান বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নৌ-সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতার এক স্পষ্ট বার্তা প্রদান করল। ইরানের সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৪ সালের এই ব্যাপক সংস্কারের ফলে জামারানের যুদ্ধক্ষমতা বা কমব্যাট ইফেক্টিভনেস তার আদি অবস্থার তুলনায় অন্তত পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাহাজটির পুরনো রাডার ও সেন্সর ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সেখানে বসানো হয়েছে ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক 'ফেজড-অ্যারে রাডার'। ধারণা করা হচ্ছে, এটি দেশটির 'বাভার' বা 'ঈগল আই' সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূর থেকে আকাশপথে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সক্ষম।
এছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এতে নতুন প্রজন্মের ভার্টিক্যাল লঞ্চ সিস্টেম (ভিএলএস) যুক্ত করা হয়েছে, যা ৫০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পাল্লার মধ্যম দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম। জাহাজ বিধ্বংসী পুরনো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরিয়ে সেখানে ৩০০ কিলোমিটার পাল্লার নতুন ক্রুজ মিসাইল স্থাপন করা হয়েছে, যা সমুদ্রযুদ্ধে জামারানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
জামারানের এই নির্মাণ ও সংস্কার ইরানের জন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। সাফাবিদ সাম্রাজ্যের পর দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে ইরানে বড় আকারের কোনো যুদ্ধজাহাজ তৈরি হয়নি। ২০১০ সালে জামারান সাগরে ভাসার মাধ্যমে ইরান বিশ্বের সেই গুটিকয় দেশের তালিকায় (১৫টিরও কম) নাম লেখায়, যাদের নিজস্ব নকশায় ডেস্ট্রয়ার তৈরির সক্ষমতা রয়েছে।
গত দেড় দশকে এই জাহাজটি এডেন উপসাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে ৪,৫০০-এরও বেশি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাঙ্কারকে নিরাপত্তা দিয়েছে এবং বহুবার জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করেছে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যৌথ মহড়াতেও এর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে জামারান ভারত মহাসাগরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌ-মহড়ায় অংশ নিচ্ছে।
এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক কনভয়গুলোকে নিরাপত্তা দেওয়া এবং বিভিন্ন দেশের বন্দরে গিয়ে নৌ-কূটনীতি জোরদার করাও এর বর্তমান মিশনের অংশ। একইসাথে মহাসাগরের উত্তাল ও বাস্তব পরিস্থিতিতে এর নতুন ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং ইঞ্জিনের সক্ষমতাও যাচাই করা হচ্ছে।
সংস্কারের পর জাহাজটি এখন কোনো উপকূলীয় সহায়তা ছাড়াই একটানা ৬০ দিন গভীর সমুদ্রে অবস্থান করতে সক্ষম। বিশ্লেষকদের মতে, জামারানের এই পুনরুত্থান কেবল একটি জাহাজের ফিরে আসা নয়, বরং এটি ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের পরিপক্বতা এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দেশটির দীর্ঘমেয়াদী উচ্চাকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন।