ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি-র স্থলবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই মহড়াটি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শনী নয়, বরং সাম্প্রতিক ১২ দিনের যুদ্ধের পর বিশ্বমঞ্চে তেহরানের ঘুরে দাঁড়ানোর এক বলিষ্ঠ বার্তা। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা এখন আর কেবল আঞ্চলিক খেলোয়াড় নয়, বরং একটি শক্তিশালী পূর্ব দেশীয় জোটের নেতৃত্বে থাকার যোগ্যতা রাখে।
মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইআরজিসি-র পলিটিক্যাল স্টাডিজ সেন্টারের প্রধান আলী হায়দারি এই মহড়াকে সন্ত্রাস দমনে ইরানের কেন্দ্রীয় ভূমিকার বহিঃপ্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও-র সদস্য হিসেবে ইরান এই প্রথমবারের মতো নিজেদের মাটিতে এমন কোনো মাঠপর্যায়ের মহড়ার আয়োজন করল।
এতে প্রমাণ হয় যে, সংস্থাটিতে ইরান এখন আর কেবল নতুন সদস্য নয়, বরং কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চালকের আসনে অবতীর্ণ হয়েছে। মহড়ায় বেলারুশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, রাশিয়া, তাজিকিস্তান এবং উজবেকিস্তানের মতো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো অংশ নিচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি আরব, ইরাক ও আজারবাইজানের মতো অতিথি রাষ্ট্রের উপস্থিতি এই অঞ্চলের পরিবর্তিত কূটনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দেয়, যা ব্যাপক আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের প্রতিফলন।
পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশকে এই মহড়ার জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে গভীর কৌশলগত কারণ। এই অঞ্চলটি উত্তর-দক্ষিণ আন্তর্জাতিক করিডোর এবং কাস্পিয়ান সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত জ্বালানি পরিবহন রুটের অন্যতম সংযোগস্থল। ককেশাস ও মধ্য এশিয়ার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই স্থানে মহড়া চালিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিল যে, গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক রুটগুলোর নিরাপত্তা বিধানে এবং সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায় তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিন দিনব্যাপী এই মূল অপারেশনে তাজা গোলাবারুদ ব্যবহারের পাশাপাশি ‘সুইসাইড মাইক্রো এয়ার ভেহিকল’ বা এমএভি-র মতো নিজস্ব প্রযুক্তির অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের প্রদর্শনী করা হচ্ছে। এই মহড়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্যও সুদূরপ্রসারী। পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে সন্ত্রাসবাদকে নিজেদের স্বার্থে ‘ভালো’ বনাম ‘খারাপ’-এই দুই ভাগে বিভক্ত করে, ইরান ও তার মিত্ররা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
সাহান্দ-২০২৫ মহড়ার মাধ্যমে প্রাচ্যের দেশগুলো সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি নিজস্ব ও স্বাধীন সংজ্ঞা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। ১২ দিনের যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে ওঠার পরপরই এমন আয়োজন তেহরানের সামরিক সক্ষমতা ও অটুট আত্মবিশ্বাসেরই প্রমাণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কেবল সামরিক সহযোগিতা নয়, বরং এসসিও ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক আস্থার সম্পর্কও জোরদার করবে।
সাহান্দ-২০২৫ মহড়া প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে গিয়েও প্রাচ্যের দেশগুলো একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম, যেখানে তেহরান এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে।