মঙ্গলবার দেশটির কারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ওপর থেকে সব ধরনের আইনি বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং তাঁর চূড়ান্ত মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এক বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এই প্রবীণ রাজনীতিক আট মাস সাজা ভোগের পর, বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত মাসেই প্যারোলে মুক্তি পেয়েছিলেন।
দেশটির কারা বিভাগের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, শর্তসাপেক্ষ প্যারোলে মুক্তির অংশ হিসেবে ছিয়াত্তর বছর বয়সী থাকসিনের পায়ে বাধ্যতামূলকভাবে একটি বৈদ্যুতিক নজরদারি যন্ত্র পরানো ছিল, যাতে সার্বক্ষণিকভাবে তাঁর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তবে তাঁর কারাদণ্ডের মেয়াদ এক বছরের কম বাকি থাকার সুবাদে, গত ৩ জুন রানি সুথিদার জন্মদিন উপলক্ষে রাজক্ষমা পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের বিশেষ তালিকায় এই টেলিকম ধনকুবেরের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার কারা কর্তৃপক্ষ তাঁর পা থেকে নজরদারি যন্ত্রটি স্থায়ীভাবে অপসারণ করে। পাশাপাশি, কারাসদর দপ্তর থেকে থাকসিনের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত মুক্তির সব আইনি নথিপত্র এবং নিঃশর্ত খালাসের প্রশংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়।
কারা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী এখন থেকে আর কোনো ধরনের ফৌজদারি শাস্তি, রাষ্ট্রীয় নজরদারি বা আইনি শর্তের অধীনে নেই।
থাইল্যান্ডের দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় আইনি প্রথা অনুযায়ী, রাজা ও রানির জন্মদিনসহ বিভিন্ন প্রধান রাজকীয় উৎসবে সদ্ব্যবহারকারী বন্দিদের এভাবেই নিয়মিত রাজক্ষমা বা সাজা মওকুফ করা হয়ে থাকে।
আধুনিক থাই রাজনীতির ইতিহাসে থাকসিন সিনাওয়াত্রা এক অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত। জনপ্রিয় এই নেতা পর পর দুই মেয়াদে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন, কিন্তু ২০০৬ সালের এক সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের আকস্মিক অবসান ঘটে।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জীবনের দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় তিনি মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে স্বেচ্ছানির্বাসনে কাটিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসন শেষে গত ২০২৩ সালে তিনি যখন পুনরায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তাঁকে ঘিরে থাই রাজনীতিতে নতুন করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় থাই গণমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আইনি বাধা দূর হওয়ার পর চলতি মাসেই তিনি আবারও দুবাই সফরে যেতে পারেন। যদিও তাঁর এই সম্ভাব্য বিদেশ সফরের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
এই বিষয়ে মন্তবের জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে তাঁর আইনি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কারও সাড়া পাওয়া যায়নি।
একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে থাইল্যান্ডের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে থাকসিনের ‘ফেউ থাই পার্টি’ এবং এর পূর্বসূরি রাজনৈতিক দলগুলো অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করে আসছে।
সিনাওয়াত্রা পরিবারের ঐতিহ্য এতটাই প্রভাবশালী যে, এই পরিবার থেকে এ পর্যন্ত চারজন সদস্য দেশের শীর্ষ নির্বাহীর আসন অলংকৃত করেছেন। বিশেষ করে দেশের বিশাল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই পরিবারের দীর্ঘদিনের সুদৃঢ় ও একচেটিয়া সমর্থন রয়েছে।
তবে গত নির্বাচনে ফেউ থাই পার্টি তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। নির্বাচনে দলটির ফলাফল এতটাই হতাশাজনক ছিল যে, তারা জনপ্রিয়তায় তৃতীয় স্থানে নেমে যায়।
দলটির এই আকস্মিক নির্বাচনী পতন থাই রাজনীতির অন্দরমহলে থাকসিনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং তাঁর সামগ্রিক রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে গভীর সংশয় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।