কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ইমরান খানের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে এক বিশাল লংমার্চ শুরু করেছেন তাঁর লাখ লাখ অটল সমর্থক।
সোমবার দেশটির প্রধান বিরোধী দল ও সাবেক এই সরকারপ্রধানের রাজনৈতিক সংগঠন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের এই সুবিশাল গণযাত্রার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই গণপদযাত্রা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার এই পারমাণবিক শক্তিধর দেশটিতে নতুন করে চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাতের তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
দলীয় সূত্র, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোববার পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে এই সুদীর্ঘ লংমার্চের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল এই খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে বর্তমানে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের নিজস্ব প্রাদেশিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে।
এই সরকারি অবস্থান দলটির চলমান আন্দোলনকে আরও বেশি প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক ও কাঠামোগত শক্তি জুগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, দীর্ঘ এই গণযাত্রায় অংশগ্রহণকারী লাখ লাখ জনতা প্রদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, শহর ও প্রান্তর প্রদক্ষিণ করবে এবং পূর্বনির্ধারিত একাধিক স্থানে যাত্রাবিরতি শেষে চূড়ান্ত গন্তব্য রাজধানী ইসলামাবাদে গিয়ে পৌঁছাবে।
এই বিশাল লংমার্চের সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি। তিনি তাঁর আবেগঘন ও উদ্দীপ্ত বক্তৃতায় উপস্থিত বিপুলসংখ্যক সমর্থক ও দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, তিনি সকলকে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে সব ধরনের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসার আকুল আহ্বান জানাচ্ছেন।
বিশেষ করে তরুণসমাজের প্রতি তাঁর উদাত্ত আহ্বান ছিল, তারা যেন তাদের কারারুদ্ধ প্রিয় নেতার স্বার্থ রক্ষার্থে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মকভাবে রাজপথে নেমে আসে।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে নিবিড়ভাবে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, বর্তমানের এই তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল মূলত ২০২২ সালে। সে বছর দেশটির জাতীয় পার্লামেন্টে এক অত্যন্ত নাটকীয় ও বিতর্কিত অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে পিটিআই নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর থেকেই চৌয়াত্তর বছর বয়সী সাবেক এই কিংবদন্তি ক্রিকেট তারকা ও জনপ্রিয় রাজনীতিক ইমরান খান ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছেন যে, তাঁর সরকারের আকস্মিক পতনের পেছনে দেশের প্রতাপশালী সামরিক বাহিনীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হাত ছিল। তাঁর মতে, একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার কারণেই তাঁকে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যদিও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালনকারী সামরিক বাহিনী বরাবরই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
রাজনৈতিক এই টানাপোড়েন চরম ও সহিংস আকার ধারণ করে গত ২০২৩ সালের মে মাসে, যখন ইমরান খানকে একটি দুর্নীতির মামলায় আদালত প্রাঙ্গণ থেকে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে তীব্র সহিংসতা ও নজিরবিহীন দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।
ক্ষুব্ধ ও আবেগতাড়িত সমর্থকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক হামলা চালায়, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও অভাবনীয় ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনার জের ধরে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড় ও নজিরবিহীন দমনপীড়ন।
পিটিআইয়ের হাজার হাজার নেতাকর্মী, শীর্ষ নেতা, নারী কর্মী ও সাধারণ সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরবর্তীকালে সামরিক আদালতে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে বহু সমর্থককে কঠোর সাজা প্রদান করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমরান খান নিজেকে একজন সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে বর্তমান বেসামরিক সরকার ও দেশের সামরিক নেতৃত্ব তাঁকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে মানতে নারাজ। এর বদলে তারা দেশের বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতির কথা বারবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরছেন।
বিচারিক আদালতে ইতিমধ্যে দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁসসহ একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন ইমরান খান। তবে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কেবল একটি নির্দিষ্ট মামলা ব্যতীত তাঁর অন্য সব সাজা স্থগিত কিংবা বাতিল করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁর সুদক্ষ আইনজীবীরা।
বর্তমান এই লংমার্চ কর্মসূচিটি মূলত গত ২৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। দেশজুড়ে পিটিআই সমর্থকরা সেই অনুযায়ী ব্যাপক প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পিটিআইয়ের উত্থাপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং সংঘাত এড়াতে সাময়িকভাবে লংমার্চ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিটিআই নেতৃত্ব।
তবে গত সপ্তাহের শেষের দিকে সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতাদের সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সম্পূর্ণভাবে ভেস্তে যায়। আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর রাজপথের কঠোর আন্দোলন ছাড়া দলটির সামনে আর কোনো সম্মানজনক বিকল্প খোলা ছিল না।
এর আগে গত দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত পিটিআইয়ের সর্বশেষ বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে রাজধানী ইসলামাবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সাধারণ জনতার যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, তা দেশবাসীর মনে আজও এক গভীর ট্রমা ও ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে।
তাই সম্ভাব্য যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিশৃঙ্খলা, ব্যাপক সহিংসতা, সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়াতে বর্তমানে রাজধানী ইসলামাবাদ ও এর আশপাশের সম্পূর্ণ অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ ও সুসজ্জিত আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সংবলিত অতিগুরুত্বপূর্ণ রেড জোন ও সরকারি চত্বর সুরক্ষিত রাখতে বড় বড় শিপিং কনটেইনার দিয়ে পুরো এলাকার প্রবেশপথগুলো সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং শক্তিশালী ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে।
এককথায়, রাজধানী শহরটিকে কার্যত এক নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে এনে একটি অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত করা হয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের চলাচলেও ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, যেকোনো মূল্যে এই বিশাল জনস্রোতকে ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে না দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত কঠোর ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তানের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি এক সংবাদ সম্মেলনে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সরকার এই চলমান রাজনৈতিক সমস্যা ও নৈরাজ্যের নিস্পত্তি একেবারে চিরতরে করতে বদ্ধপরিকর।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, কোনো একক রাজনৈতিক দলকে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দেশের রাজধানীর স্বাভাবিক কাজকর্ম, জনজীবন, শিক্ষাব্যবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির কোনো সুযোগ রাষ্ট্র কিছুতেই দিতে পারে না।
সরকারের পক্ষে পিটিআইয়ের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সেই ব্যর্থ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি নিজেই। তিনি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন যে, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত যৌথ নীতিতে ইমরান খানের দল কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় মূলত এই আলোচনা ভেস্তে গেছে।
তবে পিটিআই কেন্দ্রীয় সরকারের এই দাবি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দলটির মুখপাত্র ও শীর্ষ নেতারা বলেছেন, সরকার মূলত আলোচনার নামে সম্পূর্ণ অন্যায্য ও অসাংবিধানিক শর্ত চাপিয়ে দিয়ে বিরোধী দলকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার এক সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা চালিয়েছিল, যা একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে পিটিআই মেনে নিতে পারে না।
উল্লেখ্য, আফগানিস্তান সীমান্তসংলগ্ন এই স্পর্শকাতর অঞ্চলে গত কয়েক মাসে জঙ্গি ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উদ্ভূত এই জটিল রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভিসহ দেশটির কয়েকজন প্রবীণ মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ইমরান খানের দল পরিচালিত প্রাদেশিক সরকার যদি রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে সমর্থিত সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ নীতি অনুসরণে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশের সাংবিধানিক ও আইনি সুযোগ কাজে লাগিয়ে যেকোনো মুহূর্তে ওই প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে সেখানে গভর্নরের শাসন জারি করার মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল বিষয়টির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।