আপাতদৃষ্টিতে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার কৌশলগত এই প্রদেশটির প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতার ওপর।
বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের এই অগণতান্ত্রিক প্রবণতা সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সমর্থন ও আস্থাকে তলানিতে নিয়ে যাওয়ার বিশাল ঝুঁকি তৈরি করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ওই অঞ্চলে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার যে নিরন্তর প্রচেষ্টা, তা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল সামরিক শক্তি ও কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর না করে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা, স্থানীয় জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা এবং কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের ওপর সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মধ্যকার যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে পারস্পরিক আলোচনা ও গণতান্ত্রিক সমঝোতার পথ পরিহার করে ক্রমান্বয়ে পেশিশক্তি ও বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
দেশের আইনসভা, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী বিভাগের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তম্ভগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও সাধারণ জনগণের মনে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে অক্টোবর মাসটি বরাবরই চরম সংকট, অস্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের এক অন্ধকার সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালের জরুরি অবস্থা ঘোষণা, ১৯৫৮ ও ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকেই বারবার উন্মোচিত করেছে।
সিন্ধু প্রদেশে গভর্নর শাসন জারির অতীত ইতিহাসও এই অগণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। বর্তমান সময়ে বিতর্কিত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত সংসদকে সাধারণ মানুষ কেবল দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার এবং রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও উসকে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচনা করছে।
দেশের সর্বোচ্চ আদালতও অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বিচারকের ভূমিকা পালনের পরিবর্তে সমালোচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ যৌক্তিক ভিন্নমত ধারণ করার পরিবর্তে কঠোর দমন-পীড়নকেই তাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে, সেই সংঘাত রাজপথে ছড়িয়ে পড়ার একটি প্রবল আশঙ্কা থাকে। রাষ্ট্রযন্ত্র হয়তো রাজপথের আন্দোলন সাময়িকভাবে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করতে পারে, কিন্তু সেই জনরোষ সশস্ত্র প্রতিরোধের পর্যায়ে পৌঁছালে তা নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের মধ্যকার বিরোধ এখন এক চরম ও অস্থিতিশীল পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে।
কারাবন্দি পিটিআই নেতা ইমরান খানের সঙ্গে দলীয় নেতাদের সাক্ষাৎ এবং তার জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার মতো অত্যন্ত মৌলিক ও আইনি দাবির প্রতিও সরকার একগুঁয়ে ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
মূলত এই সাংঘর্ষিক অবস্থানের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবেই খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা এবং গভর্নর শাসন জারির মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকারের বিতর্কিত শাসনব্যবস্থা এবং গত নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে দেশজুড়ে যে বিপুল প্রশ্ন রয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে অবাধ নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নতির মতো বৃহত্তর দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে।
সেই তুলনায় ইমরান খানের আইনি অধিকার নিশ্চিত করার দাবিটি ছিল খুবই সামান্য। ২০২৩ সাল থেকে পিটিআই নেতাকর্মীদের ওপর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে ধারাবাহিক দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে, সেটি দলটির বর্তমান অনড় অবস্থানের পেছনে একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
সরকারের উচিত ছিল প্রথমেই নিজেদের নীতিগত ত্রুটিগুলো সংশোধন করে পিটিআইকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা। কিন্তু গঠনমূলক সমঝোতার পথে না হেঁটে উল্টো শক্তি প্রয়োগের পথে অগ্রসর হওয়ায় দেশটিতে রাজনৈতিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরেও পাকিস্তানে অবস্থানরত আফগান নাগরিকদের জোরপূর্বক বিতাড়নের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার যে চরম কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে।
আফগানিস্তানের বর্তমান তালেবান সরকারের যেকোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ভার সাধারণ ও নিরপরাধ আফগান নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায়সংগত হতে পারে না। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিক দেশটির অর্থনীতি এবং শ্রমবাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো পাকিস্তানি নাগরিকদের কারণে দেশটিতে শ্রমের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, আফগান নাগরিকরা তাদের শ্রম দিয়ে তার অনেকটাই পূরণ করে আসছেন। সাধারণ আফগানদের সবাইকে ঢালাওভাবে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
ফলে সবাইকে সম্ভাব্য জঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা দূরদর্শী কাজ নয়। জোরপূর্বক ও অমানবিক বিতাড়নের ফলে ছিন্নমূল এই মানুষদের মধ্যে যদি গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়, তবে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী খুব সহজেই তাদের নিজেদের দলে ভেড়ানোর সুযোগ পেয়ে যাবে।
অর্থাৎ, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপই উল্টো নিরাপত্তা ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতার জন্য সরকার একতরফাভাবে প্রাদেশিক সরকার তথা পিটিআইকে দায়ী করলেও, এই বিশাল সমস্যাটির একক দায় কোনোভাবেই কেবল তাদের ওপর চাপানো যায় না।
জঙ্গিরা যখন অবাধে আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, তখন সার্বিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের একটি সমান ও যৌথ দায়িত্ব রয়েছে।
অতীতে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালালে স্থানীয় নিরীহ জনসাধারণ চরমভাবে বাস্তুচ্যুত হন। তাই নির্দিষ্ট এলাকা ধরে ব্যাপক সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরিবর্তে, নিখুঁত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক কমান্ডো অভিযান পরিচালনা করা এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় করে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা অনেক বেশি কার্যকর ও মানবিক হতে পারে।
জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা না করে কেবল রাজনৈতিক বিরোধের জেরে প্রাদেশিক সরকারকে দুর্বল করার এই উদ্যোগ সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সমন্বয়কে আরও বেশি কঠিন করে তুলবে।
জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং গভর্নর শাসন জারির এই চরম সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় অত্যন্ত অতিরিক্ত এবং অযৌক্তিক কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার সম্ভাবনা এবং গণতান্ত্রিক কর্মসূচি চলছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এমন স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত যেকোনো ধরনের অর্থবহ রাজনৈতিক সমঝোতার পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিতে পারে।
এই পদক্ষেপ সাময়িকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করলেও, সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক বৈধতা বা স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন নিশ্চিত করে না। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি কাঠামোকে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার ফলে পিটিআই সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন আরও প্রবলভাবে জ্বলে উঠবে।
একই সঙ্গে দলটি নিজেদের রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে তাদের লাভবান করতে পারে। বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র ক্ষমতা অর্জন করলেও সাধারণ মানুষের জন্য কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
এমতাবস্থায় সংঘাতময় খাইবার পাখতুনখোয়ায় একটি অজনপ্রিয় প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব। অতীতের বিভিন্ন সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, রাজনৈতিক বিরোধে রাষ্ট্র সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে বলপ্রয়োগ করে দমিয়ে রাখতে পারলেও, সংঘাত সশস্ত্র প্রতিরোধের পর্যায়ে পৌঁছালে তা নির্মূল করা সম্ভব হয় না।
তাই ‘কে জিতবে, কে হারবে’-এমন একগুঁয়ে মানসিকতা নিয়ে এগোনোর পরিবর্তে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি টেকসই সমাধান খোঁজা অত্যন্ত জরুরি। পরিশেষে, সন্ত্রাসবাদ নামক এই ব্যাধিকে মোকাবিলা করতে হলে কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় জনগণের অকুন্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতাও অপরিহার্য।
বলপ্রয়োগের কারণে যদি স্থানীয় জনগণের মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়, তবে বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও সেই আস্থার ঘাটতি কখনোই পূরণ করা সম্ভব হবে না। সীমান্তের ওপারে টিটিপির প্রশিক্ষণশিবিরগুলোতে বিমান হামলা চালিয়ে সাময়িক ক্ষতিসাধন করা গেলেও, সন্ত্রাসবাদের মূল রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যাবে।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে অনুগত রাজনৈতিক অংশীদারদের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করা যায়নি। খাইবার পাখতুনখোয়াতেও ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকার অনুগত পুতুল রাজনৈতিক অংশীদার পেয়ে গেলেও, তাদের যদি ন্যূনতম জনসমর্থন ও নিজস্ব প্রশাসনিক সক্ষমতা না থাকে, তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করা যাবে না। সন্ত্রাসবাদ দমনের একটি কার্যকর কৌশলে সামরিক অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা এবং একটি শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নিখুঁত সমন্বয় থাকতে হবে।
শুধু বলপ্রয়োগের ওপর নির্ভর করলে সমস্যার মূল কারণগুলো চিরকাল অমীমাংসিত থেকে যাবে। রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাকে উপেক্ষা করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাবে না, বরং সরকারের এমন নীতি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও দীর্ঘায়িত ও জটিল করে তুলবে।