বুধবার, অক্টোবর ১৪, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাবের অনুমোদন দিল পাকিস্তানের পার্লামেন্ট

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:১১ পিএম

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাবের অনুমোদন দিল পাকিস্তানের পার্লামেন্ট
ছবি : Collected

পাকিস্তানের রাজনীতিতে আবারও নতুন করে অস্থিরতা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বুধবার খাইবার পাখতুনখাওয়া (কেপি) প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে পাকিস্তানের ফেডারেল সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তটি জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) পাশাপাশি উচ্চকক্ষ সিনেটেও চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে।

 

প্রদেশে সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রাদেশিক সরকারের চরম অনীহা এবং কথিত অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেই গত রোববার কেন্দ্র সেখানে গভর্নরের শাসন ও জরুরি অবস্থা জারির মতো কঠোর ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।

 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্প্রতি কারাবন্দি নেতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআই-এর ডাকা দেশব্যাপী লংমার্চ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে তাদের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বই এই পদক্ষেপের মূল অনুঘটক।

 

বুধবার পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে এই সংক্রান্ত প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন পাকিস্তানের সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী। এরপর থেকে এই পদক্ষেপের বৈধতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।

 

সিনেটের তীব্র বিতর্ক ও পিটিআইয়ের ওয়াকআউট

বুধবার সিনেট অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে পিটিআইয়ের সিনেটররা ক্ষোভে অধিবেশন কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন। বিরোধী সদস্যদের তুমুল হট্টগোল ও প্রতিবাদের মধ্যেই সরকারি দল বা ট্রেজারি বেঞ্চের সদস্যরা প্রস্তাবটি পাস করিয়ে নেন।

 

সিনেটে প্রস্তাবটির আইনি ভিত্তি ও যৌক্তিকতা জোরালোভাবে রক্ষা করেন আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার। তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, সম্পূর্ণ সাংবিধানিক নিয়মনীতি অনুসরণ করেই প্রস্তাবটি হাউসে উত্থাপন করা হয়েছে। সংবিধানের ২৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান উল্লেখ করে তিনি বলেন, "জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুলিপি যথাযথভাবে হাউসে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

কেউ চাইলেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না।" আইনমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থেকে উৎসারিত কোনো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সাত দিনের অগ্রিম নোটিশ দেওয়ার সাধারণ নিয়মটি প্রযোজ্য নয়।

 

তিনি বিরোধীদের উদ্দেশ্যে বলেন, "কারো আপত্তি থাকলে বিতর্কের পর ভোটের মাধ্যমে সেটি বাতিল করতে পারেন, কিন্তু আমরা কোনোভাবেই সংবিধান বা হাউসের নিয়ম লঙ্ঘন করতে পারি না।"

 

অধিবেশন চলাকালে বিরোধী বেঞ্চের সদস্যদের ক্রমাগত স্লোগান ও হইচইয়ের কারণে সিনেট চেয়ারম্যান ইউসুফ রাজা গিলানি বারবার তাদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, "এটি কোনো শ্রেণিকক্ষ নয়, আপনারা দয়া করে শব্দ দূষণ করবেন না।"

 

পিটিআইয়ের সিনেটর হুমায়ুন মোহমান্দ সরকারের এই পদক্ষেপকে পূর্বপরিকল্পিত বলে তীব্র অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, বেশ কয়েক মাস আগেই স্বতন্ত্র সিনেটর ফয়সাল ভাওদা এমন একটি ব্যবস্থার কথা জনসমক্ষে বলেছিলেন।

 

মোহমান্দ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, "সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়টি নিছকই একটি অজুহাত। এই জরুরি অবস্থা জারির আসল ও একমাত্র লক্ষ্য হলো পিটিআইকে ধ্বংস করা।" তিনি অতীত ইতিহাসের উদাহরণ টেনে সতর্ক করে বলেন, ১৯৭০ সাল থেকে ফেডারেল সরকারের নেওয়া এ ধরনের একতরফা সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়েছে এবং দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

 

পিটিআই সমর্থিত আরেক প্রবীণ সিনেটর হামিদ খানও একই ধরনের অভিযোগ করেন। কেন্দ্র ও বিরোধী দলের মধ্যে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনার বিষয়টিকে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে একটি "নাটক ও প্রতারণা" বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, "আসল সিদ্ধান্ত তো অনেক আগেই অন্য কোনো জায়গা থেকে নেওয়া হয়েছিল।"

 

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২৬তম সংশোধনীর পর দেশে এখন আর প্রকৃত কোনো স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা বা কার্যকরী সংবিধান অবশিষ্ট নেই। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণের ফলে এই ধরনের অসাংবিধানিক পদক্ষেপকে আইনি চ্যালেঞ্জ করার সমস্ত পথও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

পিটিআইয়ের আরেক জ্যেষ্ঠ সিনেটর মহসিন আজিজ ফেডারেল মন্ত্রীদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন, যারা পিটিআইকে সন্ত্রাসীদের সহায়তাকারী হিসেবে চিত্রিত করছেন। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "আপনারা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু এর কতটা আপনারা জানেন?

 

কেপির মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেদের সন্তানদের লাশ কাঁধে বহন করেছে। যারা কেপির বীর ও আত্মত্যাগী জনগণকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যা দেয়, তাদের লজ্জা হওয়া উচিত।" তিনি দাবি করেন, সন্ত্রাসবাদ মূলত বেকারত্ব, ক্ষুধা, শিক্ষার অভাব এবং বঞ্চনার ফসল।

 

জেইউআই-এফ নেতা কামরান মুর্তজা অভিযোগ করেন যে, গভর্নরের শাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাবটি পরিকল্পিতভাবেই দিনের কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তিনি দাবি করেন, সরকার প্রয়োজনীয় আইনি দলিল ও তথ্যাদি সরবরাহ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে সিনেটরদেরকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

 

জাতীয় পরিষদে অনুমোদন ও বিলাওয়ালের মন্তব্য

জরুরি অবস্থা নিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে বুধবার জাতীয় পরিষদের নিয়মিত প্রশ্নোত্তর পর্বটি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছিল। নিম্নকক্ষে আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারারের প্রারম্ভিক আলোচনার পর প্রস্তাবটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদিত হয়।

 

সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি প্রেসিডেন্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাজ করেন, তবে জরুরি অবস্থার ঘোষণাপত্র ১০ দিনের মধ্যে অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক।

 

বুধবারের অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যরা আগের মতো উচ্চস্বরে প্রতিবাদ না করে কিছুটা শান্তভাবেই অংশ নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন এবং বিরোধী দলীয় নেতা মেহমুদ খান আচাকজাইয়ের সাথে করমর্দন করতে দেখা গেছে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছে।

 

জাতীয় পরিষদে দেওয়া এক সুদীর্ঘ ভাষণে পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি পিটিআইকে দায়ী করেন। তিনি কেপিতে পিটিআইয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে তাদের দলের জন্য একটি "রাজনৈতিক আত্মঘাতী হামলা" বলে আখ্যায়িত করেন।

 

তবে তিনি এই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও উভয় পক্ষকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসার এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে একটি যৌথ, ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

বিলাওয়াল জোর দিয়ে বলেন, "কেন্দ্র পিটিআইয়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পিটিআইয়ের নেতৃত্বই তাদের প্রাদেশিক সরকারকে এই আত্মঘাতী পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।"

 

তিনি আরও বলেন, এই অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ এড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে পিটিআইয়ের সাথে বোঝাপড়ার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তারা সেটি কাজে লাগাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

 

জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক ৩ অক্টোবরের আলোচনার পরিবেশকে আন্তরিক বলে প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতের জন্য একই ধরনের সংলাপ কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

 

পিটিআইয়ের কড়া জবাব ও মন্ত্রীদের অবস্থান

পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর আলী খান জাতীয় পরিষদে দাঁড়িয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "ইমরান খানের স্ত্রী বা বোনেরা কোন সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত ছিলেন যে তাদের জেলে আটকে রাখা হয়েছে?"

 

তিনি দাবি করেন, পিটিআই সবসময়ই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল এবং তারা ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান (এনএপি) অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পিটিআইয়ের অতীত ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, পিটিআই সরকার একসময় নিষিদ্ধঘোষিত টিটিপি সদস্যদের পুনর্বাসনের জন্য যে বিপজ্জনক উদ্যোগ নিয়েছিল, তা দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল।

 

তিনি বিরোধী দলকে তাদের অতীতের ভুলগুলো স্বীকার করার এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। এমকিউএম-পি নেতা ফারুক সাত্তারও প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে পিটিআইকে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান।

 

সার্বিকভাবে, পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে এই জরুরি অবস্থার অনুমোদন রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও নতুন করে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

 

- ডন