রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির বা সিজেপির পূর্বঘোষিত এই প্রতিবাদী কর্মসূচির ওপর কোনো ধরনের স্থগিতাদেশ বা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে সাফ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর বিচারিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
উচ্চ আদালতের এই দ্ব্যর্থহীন অবস্থানের ফলে রাজধানী দিল্লির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা দিল্লি পুলিশ চরম কৌশলগত ও প্রশাসনিক অস্বস্তির মুখে পড়েছে। আন্দোলন বন্ধের আইনি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় এখন সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজপথের সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করাই নগর পুলিশের জন্য প্রধান পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিতর্কের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল দেশের চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় কথিত কারচুপির গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত দশই অক্টোবর ভোটার তালিকায় ব্যাপক জালিয়াতির বিরুদ্ধে দিল্লির ঐতিহ্যবাহী যন্তর মন্তর এলাকায় এক বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি।
তবে সেই দিন ওই নির্ধারিত সমাবেশস্থলে পৌঁছানোর আগেই পুলিশ শত শত প্রতিবাদকারী, অধিকারকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীকে রাজপথ থেকে আটক করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশের এই ধরনের নজিরবিহীন দমনপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
একই জাতীয় ইস্যুতে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট ‘ইন্ডিয়া’ও রাজধানীতে বেশ কিছুদিন ধরে সমান্তরালভাবে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে আসছে। সরকারি সিদ্ধান্ত ও নীতিমালার বিরুদ্ধে রাজপথে গড়ে ওঠা এই দুটি পৃথক বিরোধী ধারা বর্তমানে এক মোহনায় মিলিত হওয়ার স্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
রাজনীতির মাঠে এই সম্মিলিত বিরোধী ঐক্যের প্রভাব এখন অত্যন্ত দৃশ্যমান। চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শুরুর দিকে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আনুষ্ঠানিক আন্দোলন থেকে কিছুটা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে নিজস্ব কৌশল অনুসরণ করছিল।
তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কৌশলগত অবস্থান বদলে তারাও এবার সরাসরি মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে শুক্রবার কনট প্লেসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিজেপির এই গণবিক্ষোভে পূর্ণ সংহতি জানিয়ে তাদের দলীয় নেতাকর্মীরাও ব্যাপকভাবে অংশ নেবেন।
এদিকে সিজেপির প্রধান প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এক বিশেষ বার্তায় সমবেত হতে যাওয়া সকল সাধারণ নাগরিক ও প্রতিবাদকারীকে দলীয় কোনো প্রতীকের পরিবর্তে ভারতের জাতীয় পতাকা বহন করে শান্তিপূর্ণভাবে সেন্ট্রাল পার্কে সমবেত হওয়ার আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছেন।
তার এই আহ্বানের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সমাবেশটি ঘিরে এক গভীর জাতীয়তাবাদী সংবেদনশীলতার আবহ তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভের বিরুদ্ধে আনা আইনি চ্যালেঞ্জের শুনানিতে আদালত অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেছে।
দিল্লি হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিতিন বাসুদেব সাম্ব্রে এবং বিচারপতি সঞ্জয় শর্মার সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ এই সংক্রান্ত এক জরুরি রিট আবেদনের শুনানিকালে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেন।
মামলাটি মূলত দায়ের করেছিলেন মধ্য দিল্লির এক লাইসেন্সধারী সাধারণ হকার। সেই আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে দাবি তোলা হয়েছিল যে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে বারবার এমন রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ হকারদের পেশাগত অধিকার ও জীবনধারণের মাধ্যম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
শীর্ষ আদালতের পূর্ববর্তী বিভিন্ন ঐতিহাসিক নির্দেশিকার আলোকে এই সমাবেশ নিষিদ্ধ কিংবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য দিল্লি পুলিশকে তাত্ক্ষণিক অনুশাসন জারির আকুল আবেদন জানানো হয়েছিল।
উক্ত শুনানিপর্বে আবেদনকারীর বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, বর্তমানে ভারতজুড়ে প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের মরশুম চলছে। এই স্পর্শকাতর সময়ে যদি মধ্য দিল্লির বাজার ও দোকানপাট পুনরায় রাজনৈতিক প্রতিবাদের অজুহাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে নিম্ন আয়ের শত শত ব্যবসায়ী ও দিনমজুর হকারদের সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে হবে।
অন্যদিকে সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষে আদালতে হাজির হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল চেতন শর্মা আদালতকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন যে, ককরোচ জনতা পার্টির যেকোনো ধরনের বেআইনি ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ প্রশাসন ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তবে উভয় পক্ষের যুক্তি ও আশঙ্কা সতর্কতার সাথে শোনার পরও হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে রাজি হননি এবং কোনো প্রকার সাধারণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা থেকে স্পষ্টভাবে বিরত থাকেন।
আদালতের এই আইনি আদেশের দিনই বৃহস্পতিবার বিকেলে এক অত্যন্ত জনবহুল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলটির প্রধান নেতা অভিজিৎ দীপকের সাথে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সারা ভারত ছাত্র সংগঠনের নেত্রী নেহা বোরা এবং দক্ষিণ ভারতের সুপরিচিত অভিনেতা ও সামাজিক আন্দোলনকর্মী প্রকাশ রাজসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
সংবাদ সম্মেলনে অভিজিৎ দীপকে দিল্লি পুলিশের সাম্প্রতিক ভূমিকার তীব্র ও ক্ষোভপূর্ণ সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এনে জানান যে, বিগত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অন্যায়ভাবে দিল্লির রাজপথ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো থেকে প্রতিবাদী তরুণ ও শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক আটক করে অজানা স্থানে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর এমন দমনপীড়নের প্রতিবাদ জানাতে যারা রাজপথে পা বাড়াচ্ছেন, সেই প্রবীণ বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদেরও পুলিশ একইভাবে আটক করে কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। রাষ্ট্রের এমন অগণতান্ত্রিক আচরণ অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
রাজধানীর রাজপথের এই চরম উত্তেজনার আঁচ একই দিনে ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় পর্যন্ত। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা সংক্ষেপে এসআইআর সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে একটি যৌথ পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল।
সেই আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় নির্বাচন কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের প্রতি জরুরি নোটিশ জারি করেছেন। দেশের নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা এই গুরুতর প্রশ্নকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন শীর্ষ আদালত।
তবে এই শুনানির প্রেক্ষাপটে আদালত চত্বরের পবিত্রতা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক অত্যন্ত কঠোর ও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন। গত বারোই অক্টোবর বিরোধী জোটের নেতারা বারাকাম্বা রোড থেকে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে যে গণপদযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, সেই চরম অস্বস্তিকর ঘটনার প্রসঙ্গ সরাসরি টেনে আনেন প্রধান বিচারপতি।
তিনি প্রকাশ্য এজলাসে কঠোর কণ্ঠে সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়ে দেন যে, কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বিচার বিভাগকে কোনোভাবেই ভয় দেখিয়ে বা রাজপথের শক্তি প্রদর্শন করে নতিস্বীকার করাতে পারবে না। শীর্ষ আদালত সর্বদা নিরপেক্ষতা ও সাংবিধানিক বিধিমালার ভিত্তিতেই রায় প্রদান করবে।
সুপ্রিম কোর্টের মূল প্রবেশদ্বারের দিকে বিরোধী দলের ওই বিতর্কিত পদযাত্রার বিরুদ্ধে দায়ের করা অপর একটি পৃথক আবেদনের শুনানিকালে দেশের শীর্ষ আদালত বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদবসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধেও আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রেরণ করেছেন।
একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, সেই বিশেষ পদযাত্রা চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান সীমানা ও সংলগ্ন প্রাঙ্গণের যাবতীয় সিসিটিভি ফুটেজ কোনো ধরনের সম্পাদনা ছাড়াই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করতে হবে।
আদালতের এই সমান্তরাল পদক্ষেপগুলো মূলত আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার এক গভীর অঙ্গীকারকে তুলে ধরেছে। সর্বসাকুল্যে, একদিকে উচ্চ আদালতের রায়কে পুঁজি করে বিরোধীদের রাজপথে নামার চূড়ান্ত প্রস্তুতি এবং অন্যদিকে শীর্ষ আদালতের কড়া নজরদারি-এই দ্বিমুখী বাস্তবতায় শুক্রবারের কনট প্লেসের পরিস্থিতি এক অভাবনীয় রাজনৈতিক নাটকের জন্ম দিতে চলেছে।