বৃহস্পতিবার, পনেরোই অক্টোবর, প্রতিদিনের মতোই যখন স্কুলটিতে স্বাভাবিক পাঠদান চলছিল, ঠিক তখনই এই অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে। শিক্ষা গ্রহণের মতো একটি নিরাপদ পরিবেশে এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পেশোয়ার শহরজুড়ে এক গভীর শোক ও শোকাবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মর্মান্তিক এই ছাদ ধসের ঘটনায় কেবল প্রাণহানিই ঘটেনি, বরং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আরও পঞ্চাশ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের অনেকের অবস্থাই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, এই ঘটনা পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক দুর্ঘটনা, যা দেশটির ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ দ্রুত উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আহত শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে পেশোয়ারের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র লেডি রিডিং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ অসিম সংবাদমাধ্যমের কাছে এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে জানান যে, দুর্ঘটনার পর প্রথম পর্যায়ে তাদের জরুরি বিভাগে তেত্রিশটি মৃতদেহ আনা হয়েছিল।
পরবর্তীতে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট আরও দুই শিশুর মৃতদেহ হাসপাতালে নিয়ে আসার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। এর ফলে এই মর্মান্তিক ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা পঁয়ত্রিশে গিয়ে পৌঁছায়।
একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক হতাহত শিশু হাসপাতালে আসতে শুরু করলে লেডি রিডিং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে জরুরি অবস্থা বা ইমার্জেন্সি ঘোষণা করে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা আহতদের জীবন বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অনেক শিক্ষার্থীর আঘাত অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিহতের এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে যে সকল শিক্ষার্থী অকালে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বয়স ছিল চৌদ্দ বছরের নিচে। জীবনের প্রারম্ভেই এমন একটি মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না নিহতদের পরিবার ও স্বজনরা।
হাসপাতালের বাইরে এবং দুর্ঘটনাস্থলে শোকসন্তপ্ত পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজনদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পেশোয়ারের পুলিশ কর্মকর্তা ডাক্তার মিঞা সাঈদ এই দুর্ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও উদ্ধার অভিযানের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন।
তিনি জানান, তিন তলা বিশিষ্ট এই বেসরকারি স্কুল ভবনটি পেশোয়ারের অত্যন্ত জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দীর কলোনিতে অবস্থিত। দীর কলোনির রাস্তাঘাটগুলো অত্যন্ত সরু এবং ঘিঞ্জি হওয়ার কারণে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল, অ্যাম্বুলেন্স এবং ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এই কাঠামোগত ত্রুটির কারণে উদ্ধার অভিযান শুরু করতে যে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে, তা উদ্ধারকারীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, যখন স্কুল ভবনটির ওই নির্দিষ্ট অংশের ছাদটি হঠাৎ করে ধসে পড়ে, তখন ওই শ্রেণিকক্ষের ভেতরে অন্তত ত্রিশ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।
তাদের কেউই এই আকস্মিক বিপর্যয় থেকে নিজেদের রক্ষা করার কোনো সুযোগ পায়নি। মুহূর্তের মধ্যেই শ্রেণিকক্ষটি ধুলোবালি ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। উদ্ধারকর্মীরা স্থানীয়দের সহায়তায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শিশুদের উদ্ধার করার চেষ্টা চালান।
পুলিশ কর্মকর্তা মিঞা সাঈদ ভবনটির নির্মাণশৈলী নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর তিনি জানিয়েছেন যে, এই স্কুল ভবনটির নির্মাণকাজে শুরু থেকেই বেশ কিছু কাঠামোগত ত্রুটি ছিল।
সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, তিন তলা এই ভবনটির ছাদ তৈরি করা হয়েছিল সম্পূর্ণ মাটির তৈরি টাইলস ব্যবহার করে। আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর পরিবর্তে এমন ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান ব্যবহার করার কারণেই ভবনটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও ব্যাখ্যা করেন যে, স্কুল ভবনের ছাদ তৈরিতে যে ধরনের মাটির টাইলসগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোর ওজন ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। সময়ের সাথে সাথে ভবনটির দেয়াল ও মূল ভিত্তি এই অতিরিক্ত ভার সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
ফলশ্রুতিতে, ভার নিতে না পেরে এক পর্যায়ে ছাদটি সরাসরি নিচে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর ধসে পড়ে। দুর্ঘটনার পর বিশেষজ্ঞ দল ভবনটি পরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, পুরো তিন তলা ভবনটিই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং এর অন্যান্য অংশও যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে।
এই আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে উদ্ধারকর্মীরা সবার আগে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভবনের ভেতরে থাকা জীবিত অন্যান্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের নিরাপদে বাইরে বের করে নিয়ে আসেন। বর্তমানে ওই স্কুল ভবনটিকে সম্পূর্ণভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে এবং পুরো এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা পাকিস্তানের দুর্বল অবকাঠামো এবং বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন নির্মাণে নিয়মকানুনের চরম অবহেলার বিষয়টি আবারও অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জায়গা, যেখানে শত শত কোমলমতি শিশু প্রতিদিন একত্রিত হয়, সেখানকার ভবনগুলোর সুরক্ষা মানদণ্ড অত্যন্ত কঠোর হওয়া উচিত। কিন্তু দীর কলোনির এই স্কুলটির ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণের কোনো প্রকার সুরক্ষা বিধি বা ইঞ্জিনিয়ারিং মানদণ্ড মানা হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এতগুলো নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যুতে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি ও দায়িত্বহীনতা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে এমন একটি জরাজীর্ণ ও কাঠামোগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ভবনে বছরের পর বছর ধরে একটি স্কুলের কার্যক্রম চলতে দেওয়া হলো।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে ভবনটির মালিক এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বাবা-মাকে তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে এমন লাশের মিছিলে শামিল হতে না হয়।
খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাদেশিক মুখ্যমন্ত্রী নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন।
একই সাথে এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি কেবল পেশোয়ার নয়, বরং গোটা পাকিস্তানের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে।
শিশুরা হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ, আর সেই ভবিষ্যৎ যখন শিক্ষার মতো একটি মৌলিক অধিকার অর্জন করতে গিয়ে অবহেলা ও কাঠামোগত ত্রুটির কারণে এমন নির্মম পরিণতির শিকার হয়, তখন তা সমগ্র রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়।
পেশোয়ারের এই শোকাহত পরিবেশ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের অন্যান্য সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাচাই করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।