শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬
২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশ বা নেপালের মতো গণবিক্ষোভ নয়, ভোটেই সরকারের পতন চান প্রকাশ রাজ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

বাংলাদেশ বা নেপালের মতো গণবিক্ষোভ নয়, ভোটেই সরকারের পতন চান প্রকাশ রাজ
ছবি : Collected

ভারতের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে চলমান অস্থিরতা ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও জোরালো বার্তা দিয়েছেন দেশটির প্রখ্যাত অভিনেতা ও সুপরিচিত অধিকারকর্মী প্রকাশ রাজ।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের পতন নিশ্চিতভাবেই প্রয়োজন, তবে তা কোনোভাবেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ কিংবা নেপালের মতো সহিংস গণবিক্ষোভ বা আকস্মিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়।

 

শনিবার, ১৭ অক্টোবর বিখ্যাত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে প্রকাশ রাজের এই চাঞ্চল্যকর ও গভীর চিন্তাপ্রসূত মন্তব্যের কথা প্রকাশ্যে আনা হয়েছে। এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারের নানামুখী নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের ক্ষোভ ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে এবং রাজপথের আন্দোলন এক নতুন মাত্রা লাভ করতে শুরু করেছে।

 

প্রকাশ রাজ তার বক্তব্যে মূলত ভারতের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের প্রতি অগাধ আস্থা জ্ঞাপন করে ব্যালট বা ভোটাধিকারের শক্তিকে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছেন।

 

এই তীব্র সমালোচনামূলক মন্তব্যের মূল প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আয়োজিত সাম্প্রতিক ‘তিরাঙ্গা মার্চ’ বা জাতীয় পতাকা নিয়ে আয়োজিত পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে। এই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির ঠিক আগমুহূর্তে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজিপি নামক একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকসহ আরও বেশ কয়েকজন প্রথম সারির আন্দোলনকারীকে পুলিশ প্রশাসন কর্তৃক আকস্মিকভাবে আটক করার ঘটনা ঘটে।

 

এই গণগ্রেপ্তার এবং পুলিশি পদক্ষেপের অত্যন্ত কড়া ও তীক্ষ্ণ ভাষায় নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন প্রকাশ রাজ। তিনি এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর এক নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন যে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার এবং নিজেদের দাবি দাওয়া কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।

 

কিন্তু প্রশাসন সেই অধিকারকে সম্মান না দেখিয়ে উল্টো দমনপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে, যা কোনোভাবেই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি, যা এখানে মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

 

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে এনে প্রকাশ রাজ ভারতের স্বকীয় রাজনৈতিক কাঠামোর এক তুলনামূলক চিত্র জনসমক্ষে উপস্থাপন করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারত নামক রাষ্ট্রটি কোনোভাবেই বাংলাদেশ বা নেপাল নয়।

 

এই দেশগুলোর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস গণঅভ্যুত্থান বা রাজপথের প্রবল বিক্ষোভের মাধ্যমে সরকার পতনের সাক্ষী হলেও, ভারতের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তিনি ভারতের সুদৃঢ় ও সুপ্রাচীন গণতান্ত্রিক ভিত্তির কথা উল্লেখ করেছেন।

 

প্রকাশ রাজ বলেন, ভারতের সাধারণ জনগণের হাতে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সুচিন্তিত একটি সংবিধান রয়েছে, যা তাদের সর্বময় ক্ষমতার উৎস। একইসঙ্গে এই দেশের মাটি মহাত্মা গান্ধী, ডক্টর বি আর আম্বেদকর এবং ভগত সিংয়ের মতো মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসংস্কারকদের আদর্শে সিক্ত।

 

এই মহান নেতাদের দেখানো অহিংস আন্দোলন, আইনি অধিকারের প্রতি অবিচল আস্থা এবং দেশপ্রেমের যে অমূল্য শিক্ষা ভারতের জনগণের মধ্যে প্রোথিত রয়েছে, তার মাধ্যমেই সব স্বৈরাচারী মানসিকতার পতন ঘটানো সম্ভব।

 

আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ও বৈধ হাতিয়ার হলো দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের হাতে থাকা পবিত্র ভোটাধিকার, রাজপথের ধ্বংসাত্মক কোনো সংঘাত নয়। বর্তমানে ভারতের রাজপথে চলমান এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের এক দফা দাবি।

 

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। একটি কার্যকর গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা হলো রেফারির মতো, যার নিরপেক্ষতা ছাড়া পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াই একটি প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য।

 

এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে প্রকাশ রাজ প্রশাসনের চরম দমনপীড়নমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার সর্বদা তার দেশের নাগরিকদের সঙ্গে, বিশেষ করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে।

 

কিন্তু বর্তমান সরকার আলোচনার সেই গণতান্ত্রিক পথ সম্পূর্ণভাবে রুদ্ধ করে দিয়ে পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে পাশবিক শক্তি প্রয়োগ করছে। সরকারের এই একগুঁয়ে ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ সাধারণ মানুষের মনে কেবল গভীর ক্ষোভ ও হতাশারই জন্ম দিচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতিও তাদের আস্থাকে ক্রমশ দুর্বল করে তুলছে।

 

নিজের বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রকাশ রাজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত ‘হর ঘর তিরাঙ্গা’ বা প্রতিটি ঘরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের স্লোগানটির কথা দেশবাসীকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে স্মরণ করিয়ে দেন।

 

তিনি বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর দ্বৈতনীতি ও স্ববিরোধিতার দিকে সরাসরি আঙুল তুলে একটি অত্যন্ত মোক্ষম ও বিবেক দংশনকারী প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তার প্রশ্নটি ছিল, যে সরকার নিজে দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা তৈরি করতে সাধারণ মানুষকে ঘরে ঘরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানায়, সেই একই সরকারের শাসনামলে দেশের যুবসমাজ যখন সেই পবিত্র জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে, তখন কেন তাদের পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে?

 

জাতীয় পতাকা হাতে নেওয়া তরুণদের ওপর এই পুলিশি আক্রমণ কি খোদ জাতীয় পতাকার প্রতি চরম অবমাননা নয়? তার এই তীক্ষ্ণ প্রশ্নটি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে গভীর সংশয়ের জন্ম দিয়েছে।

 

এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, সরকার জাতীয়তাবাদের প্রতীকগুলোকে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।

 

ভারতের পবিত্র সংবিধান দেশের প্রতিটি নাগরিককে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার যে অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার প্রদান করেছে, সেই সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচের কথা অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রকাশ রাজ।

 

তিনি ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীকে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে পেশিশক্তির মাধ্যমে জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও ন্যায্য আন্দোলনকে কখনোই চিরতরে স্তব্ধ করা যাবে না।

 

ইতিহাস সাক্ষী, দমনপীড়ন যত বাড়ে, প্রতিবাদের আগুন তত বেশি প্রজ্জ্বলিত হয়। সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা যেকোনো সরকারের জন্যই শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়। ভারতের গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোর প্রতিও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী আহ্বান জানিয়েছেন।

 

তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভারতীয় পার্লামেন্টের আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন জনগণের এই ক্ষোভ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবির বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।

 

রাজপথে জনগণের আন্দোলন এবং সংসদের ভেতরে জনপ্রতিনিধিদের সাংবিধানিক লড়াই-এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রয়াসেই কেবল সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। পরিশেষে, ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের একটি দীর্ঘস্থায়ী ও গণতান্ত্রিক সমাধানের পথ নির্দেশ করতে গিয়ে প্রকাশ রাজ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের এক ব্যাপক ও সর্বাত্মক ঐক্যের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

 

তিনি গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এবং সরকারকে এক প্রকার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, এই প্রতিবাদী আন্দোলন কেবল গুটিকয়েক রাজনৈতিক কর্মী বা যুবসমাজের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ থাকবে না।

 

খুব শিগগিরই ভারতের সুবিশাল কৃষক সমাজ, বিভিন্ন শক্তিশালী কৃষক সংগঠন এবং দেশের বিবেকবান সুশীল সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করবে। অতীতেও ভারতের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই কৃষিজীবী মানুষ এবং নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তখনই বড় বড় স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত বাতিল করতে সরকার বাধ্য হয়েছে।

 

কৃষক ও সুশীল সমাজের এই অভাবনীয় ও সম্মিলিত সহযোগিতা যুক্ত হলে চলমান এই আন্দোলন যে একটি অপ্রতিরোধ্য ও দেশব্যাপী গণজাগরণে রূপ নেবে, সে বিষয়ে তিনি স্থির নিশ্চিত। গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পবিত্রতা ও নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং জনগণের ভোটাধিকারের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে ভারতের সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত ব্যালটের মাধ্যমেই একটি অহিংস, নিয়মতান্ত্রিক ও যুগান্তকারী রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিনিয়ে আনবে বলে তিনি তার বক্তব্যের মাধ্যমে সমগ্র দেশবাসীকে এক শক্তিশালী ও আশাব্যঞ্জক বার্তা প্রদান করেছেন।

 

- ইন্ডিয়া টুডে