মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কিম জং উন কি মারা গেছেন?

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ০৯:২২ পিএম

কিম জং উন কি মারা গেছেন?
ছবি : Collected

বিশ্বরাজনীতির অন্যতম রহস্যময় এবং রুদ্ধদ্বার রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রায়শই নানা ধরনের চাঞ্চল্যকর গুঞ্জন শোনা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে এই গুঞ্জনের পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে বিয়াল্লিশ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যু হয়েছে।

 

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের যাবতীয় জল্পনাকল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ‘রোদং সিনমুন’ সম্প্রতি বেশ কিছু আলোকচিত্র প্রকাশ করেছে। এই প্রকাশিত ছবিগুলোতে কিম জং উনকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে।

 

তিনি তার কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ একটি পোশাক ও জুতার প্রদর্শনী পরিদর্শন করছেন, এমন দৃশ্যই উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের পাতায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নটি তীব্রভাবে জেগে উঠেছে-কেন বারবার উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষমতাধর নেতার মৃত্যু নিয়ে এমন ভিত্তিহীন গুজব বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে?

 

সর্বশেষ এই গুজবটির সূত্রপাত ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত একজন চীনা ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক কর্মীর মাধ্যমে। ওয়ানজুন শিয়ে নামের ওই ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন যে, উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতাকে সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে স্থানান্তর করা হয়েছিল এবং সেখানেই তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

 

তবে ওয়ানজুন শিয়ে তার এই গুরুতর এবং চাঞ্চল্যকর দাবির স্বপক্ষে ন্যূনতম কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ বা তথ্যসূত্র উপস্থাপন করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। উল্লেখ্য, নিজেকে চীনা কর্তৃপক্ষের নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ‘চাইনিজ ডেমোক্রেটিক পার্টি’-এর চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তি এর আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিলেন।

 

ইতিপূর্বে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের আকস্মিক মৃত্যু নিয়েও ঠিক একইভাবে সম্পূর্ণ অপ্রমাণিত এবং ভিত্তিহীন দাবি প্রচার করেছিলেন। এবার তার দাবি ছিল, মস্তিষ্কে গুরুতর রক্তক্ষরণ হওয়ার পর উত্তর কোরিয়ায় পর্যাপ্ত ও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকার কারণেই কিমকে বেইজিংয়ে নেওয়া হয় এবং মৃত্যুর পর অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তার মৃতদেহ উত্তর কোরিয়ায় ফিরিয়ে এনে শাসকগোষ্ঠী পুরো বিষয়টি বিশ্ববাসীর কাছ থেকে আড়াল করে রেখেছে।

 

তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং উত্তর কোরিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের কাছে এ ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি নিয়মিত এবং পরিচিত দৃশ্যপটে পরিণত হয়েছে।

 

বিশ্বের বুকে সবচেয়ে বেশি গোপনীয়তা বজায় রাখা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উত্তর কোরিয়া অন্যতম শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নেতাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো নির্ভরযোগ্য বা নিরপেক্ষ তথ্য সংগ্রহ করা বাইরের বিশ্বের জন্য প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।

 

স্বাধীন সাংবাদিকতা বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অবাধ প্রবেশের ন্যূনতম কোনো সুযোগ সেখানে নেই। আর এই দুর্ভেদ্য গোপনীয়তার সুযোগ নিয়েই মূলত দেশটির শীর্ষ নেতাকে ঘিরে নানা ধরনের মুখরোচক জল্পনা ও মনগড়া কাহিনী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।

 

রোদং সিনমুনের প্রকাশিত ছবিগুলোতে কিম জং উনকে তার কন্যা কিম জু এ এবং নিয়মিত সফরসঙ্গী শীর্ষ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বিভিন্ন প্রদর্শনী ঘুরে দেখতে দেখা গেলেও, এই ছবিগুলো ঠিক কবে বা কোন সময়ে ধারণ করা হয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার কোনো সুযোগ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নেই।

 

আর এই তথ্যের অবাধ প্রবাহের অভাবই গুজবের প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কিম জং উনের স্বাস্থ্যের যদি সত্যিই কোনো আকস্মিক এবং গুরুতর অবনতি ঘটে থাকে, তবে উত্তর কোরিয়ার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সীমানার বাইরেও এর কিছু স্পষ্ট এবং দৃশ্যমান লক্ষণ ফুটে ওঠার কথা।

 

সাধারণত এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সংকটের মুহূর্তে সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা সীমান্ত পেরিয়ে শরণার্থীদের বিপুল ঢল সামাল দেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রতিবেশী মিত্র রাষ্ট্র চীন উত্তর কোরিয়া সীমান্তে তাদের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে জোরদার করে থাকে।

 

একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক মিশন বা দূতাবাসগুলোর প্রাত্যহিক কার্যক্রমেও এক ধরনের অস্বাভাবিক তৎপরতা বা সতর্কতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু বর্তমানে এমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন বা অস্বাভাবিকতার প্রমাণ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চোখে পড়েনি।

 

দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেওয়া যেসব উত্তর কোরীয় নাগরিক বা দলত্যাগী রয়েছেন, তারা প্রায়শই চীন সীমান্তের অনানুষ্ঠানিক, গোপন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের মাতৃভূমির অভ্যন্তরীণ খবরাখবর পেয়ে থাকেন।

 

কিন্তু এবার এই গোপন যোগাযোগ নেটওয়ার্কগুলোতেও কিমের মৃত্যুর মতো এত বড় কোনো ঘটনার ন্যূনতম কোনো ইঙ্গিত বা লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়নি। পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দক্ষিণ কোরিয়ার অত্যন্ত দক্ষ এবং তৎপর গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও সে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইয়োনহাপ’-কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কিম জং উনের মৃত্যু নিয়ে বর্তমানে যে দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচারিত হচ্ছে, তার পক্ষে তাদের কাছে কোনো ধরনের বস্তুনিষ্ঠ গোয়েন্দা তথ্য বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই।

 

কিম জং উনের স্বাস্থ্য এবং জীবন নিয়ে এমন জল্পনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০২০ সালেও সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, জটিল হৃদ্‌যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর উত্তর কোরিয়ার এই নেতার মৃত্যু হয়েছে।

 

সে সময় উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা এক উচ্চপদস্থ দলত্যাগী ব্যক্তি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছিলেন যে, কিম জং উনের মৃত্যুর বিষয়ে তিনি নিরানব্বই শতাংশ নিশ্চিত।

 

এই সংবাদটি সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। কিন্তু সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে কিছুদিন পর কিম জং উন যখন একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় প্রকাশ্যে আবির্ভূত হন, তখন সেই দাবি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পুনরায় এই অঞ্চলের খবরের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে সতর্ক করে তোলে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কিম জং উনের মৃত্যুর গুজব বারবার বিশ্বমঞ্চে ফিরে আসার অন্যতম প্রধান এবং গভীর কারণটি লুকিয়ে আছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উত্তরাধিকার নির্ধারণের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ তিন প্রজন্ম ধরে কেবল কিম পরিবারই অত্যন্ত কঠোর হাতে এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মধ্য দিয়ে এই দেশটি শাসন করে আসছে। কিন্তু কিম জং উনের অবর্তমানে ঠিক কে এই বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার হাল ধরবেন, তা নিয়ে বর্তমানে যে মাত্রার অনিশ্চয়তা এবং ধোঁয়াশা বিরাজ করছে, তা এই বংশের আগের দুই নেতার শাসনামলের তুলনায় অনেক বেশি জটিল এবং উদ্বেগজনক।

 

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কিম জং উনের দাদা এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং কয়েক দশক সময় নিয়ে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তার ছেলে কিম জং ইলকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ পদে আরোহণের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন।

 

১৯৯৪ সালে যখন কিম ইল সুং মৃত্যুবরণ করেন, তখন ক্ষমতার উত্তরাধিকার নির্ধারণের বিষয়টি দলের ভেতরে এবং বাইরে এতটাই সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুস্পষ্ট ছিল যে, কিম জং ইলের ক্ষমতা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি ছিল তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত মসৃণ এবং বাধাহীন।

 

কিন্তু কিম জং উনের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, অত্যন্ত দ্রুতগামী এবং অনেকাংশেই অনিশ্চয়তায় মোড়ানো। ২০০৮ সালে বাবা কিম জং ইল হঠাৎ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার পর তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে।

 

এই পরিস্থিতিতে তার ছোট ছেলে কিম জং উনকে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিনির্ধারণী পদে উন্নীত করা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বাবার মৃত্যুর ঠিক সামান্য কিছু সময় আগেই কিম জং উনকে দেশের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে জনগণের সামনে প্রকাশ্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

 

বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করলেও, নিজের অবস্থান এবং ক্ষমতা সুসংহত করতে কিম জং উনকে পরবর্তী কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত কঠিন এবং নির্মম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।

 

দলের অভ্যন্তরীণ সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে দেওয়া এবং নিজের ক্ষমতার জন্য যাদের তিনি বিন্দুমাত্র হুমকি বলে মনে করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিতে তিনি পিছপা হননি। এই কঠোর অভিযানের কারণেই বর্তমানে উত্তর কোরিয়ার রাজনীতিতে কিম জং উনের সমকক্ষ বা বিকল্প কোনো শক্তিশালী নেতৃত্বের দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই।

 

তবে বর্তমানে একটি নতুন দৃশ্যপট আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের জোরালো ধারণা, কিম জং উন হয়তো তার আদরের কন্যাকে ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে তিলে তিলে প্রস্তুত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।

 

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, বড় ধরনের সামরিক প্রদর্শনী এবং অস্ত্র পরীক্ষণের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থানগুলোতে কিম জং উনের পাশে তার কন্যা কিম জু এ-কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে।

 

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তাকে অত্যন্ত সম্মানজনক উপাধিতে ভূষিত করা হচ্ছে, যা উত্তর কোরিয়ার প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোতে বেশ বিরল এবং ইঙ্গিতপূর্ণ। কিন্তু এই উত্তরাধিকার পরিকল্পনার পথে বেশ কিছু বড় ধরনের এবং কাঠামোগত বাধা রয়েছে। কিম জু এ-এর বর্তমান বয়স আনুমানিক মাত্র তেরো বছর।

 

শুধু তা-ই নয়, উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো নারী দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পদে আসীন হননি। দেশটি মূলত একটি গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং সামরিক আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।

 

তাছাড়া কিম জু এ-কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় উত্তরসূরি হিসেবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। যদি কিম জং উনের আকস্মিক কোনো শারীরিক অক্ষমতা বা মৃত্যু ঘটে, তবে ক্ষমতার এই বিশাল শূন্যতা পূরণের জন্য দেশের শীর্ষ সামরিক এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে এক ভয়ংকর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে।

 

আর তেমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে অত্যন্ত অল্প বয়সী এবং অনভিজ্ঞ হওয়ার কারণে কিম জু এ নিজেও মারাত্মক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। মূলত এইসব জটিল এবং বহুমুখী কারণেই কিম জং উনের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, তার সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়ে রচিত নানাবিধ গুজব এবং উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জল্পনাকল্পনা বারবার ঘুরেফিরে সামনে চলে আসে।

 

বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর কাছে উত্তর কোরিয়ার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অস্থিতিশীল উত্তর কোরিয়া পুরো এশিয়া মহাদেশ তথা গোটা বিশ্বের জন্যই একটি মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকির কারণ হতে পারে। তাই কিম জং উনের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং তার স্বাস্থ্যগত যেকোনো খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এত বেশি গুরুত্বের সঙ্গে পরিবেশিত হয়।

 

তবে বর্তমান পরিস্থিতির সার্বিক বিশ্লেষণ এবং বাস্তব চিত্র থেকে এই কথাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, কিম জং উনের সাম্প্রতিক মৃত্যুর দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নির্ভরযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নেই, এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার সাম্প্রতিক উপস্থিতি প্রমাণ করে যে তিনি এখনো স্বমহিমায় তার দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন।

 

- বিবিসি