বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসামে উচ্ছেদ অভিযান: গৃহহীন ১১০০ মুসলিম পরিবার, ভাঙা হলো ১০টি মসজিদ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম

আসামে উচ্ছেদ অভিযান: গৃহহীন ১১০০ মুসলিম পরিবার, ভাঙা হলো ১০টি মসজিদ
ছবি : Collected

ভারতের আসাম রাজ্যে রাজ্য সরকারের নির্দেশে পরিচালিত এক আকস্মিক ও বিতর্কিত উচ্ছেদ অভিযানে বাস্তুচ্যুত হয়েছে এক হাজার একশোরও বেশি পরিবার, যাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ।

 

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই রাজ্যটির নগাঁও, গোলাঘাট এবং হোজাই জেলায় চালানো এই কঠোর অভিযানে শত শত মানুষের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থলটুকুও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর টানা দুই দিন ধরে চলা এই ধ্বংসযজ্ঞের পর ভিটেমাটি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী আশ্রয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন হাজারো শিশু, নারী ও বৃদ্ধ।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারি প্রশাসনের দাবি, উচ্ছেদের শিকার হওয়া এই পরিবারগুলো অবৈধভাবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি দখল করে বসবাস করছিল। তবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের দাবি এবং ঐতিহাসিক তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

 

আসাম বন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রল জানিয়েছে, গত রোববার নগাঁও জেলার লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছয় শতাধিক পরিবারের বসতবাড়ি বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

 

এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার ১৭ অক্টোবর, আসামের তিনটি জেলায় কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে আরও পাঁচ শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দিনেই নগাঁও জেলায় ৩৩৬টি, হোজাই জেলায় ১৫২টি এবং গোলাঘাট জেলায় ৫৯টি পরিবারসহ মোট ৫৪৭টি পরিবারের বাসস্থানের অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার ব্যবধানে ১১০০টিরও বেশি পরিবারকে তাদের দীর্ঘদিনের পরিচিত ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করা হয়েছে। বিশাল পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে পরিচালিত এই অভিযানে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ ও কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ।

 

এই উচ্ছেদ অভিযানের পেছনের কারণ হিসেবে রাজ্য সরকার বনভূমি রক্ষার যুক্তি দেখালেও, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দশকের পর দশক ধরে এই লুতুমারি এলাকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের তিনশো হেক্টরেরও বেশি জমিতে বৈধভাবেই বসবাস করে আসছিল বলে দাবি করেছে।

 

তাদের মতে, তারা কোনো অনুপ্রবেশকারী বা অবৈধ দখলদার নন, বরং সরকারই একসময় তাদের এই স্থানে পুনর্বাসিত করেছিল। উচ্ছেদের শিকার হওয়া লুতুমারি গ্রামের চুয়াল্লিশ বছর বয়সী বাসিন্দা আবদুন নূর নিজের চোখের সামনে সাজানো সংসার ধুলোয় মিশে যেতে দেখে গণমাধ্যমের কাছে তার চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

 

তিনি জানান, ১৯৭৪ সালে তৎকালীন সরকারই তাদের এই বনাঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্বাসিত করেছিল। মূলত তারা ছিলেন পার্শ্ববর্তী জুরিয়া শহরের বাসিন্দা। তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন সম্পূর্ণ ভূমিহীন কৃষক।

 

সেই ভূমিহীন অসহায় মানুষদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতেই সরকার সেসময় তিনশোটি পরিবারকে মাথাপিছু চার বিঘা করে জমি বরাদ্দ দিয়েছিল। আবদুন নূরের প্রশ্ন, যে জমি সরকার নিজেই তাদের বেঁচে থাকার তাগিদে প্রদান করেছিল, আজ সেই জমি থেকে তাদের কেন অবৈধ দখলদার আখ্যা দিয়ে উচ্ছেদ করা হচ্ছে?

 

শুধু বসতবাড়ি নয়, এই নির্মম উচ্ছেদ অভিযানে ধ্বংস করা হয়েছে মানুষের ধর্মীয় উপাসনালয়ও। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসনের বুলডোজার অন্তত দশটিরও বেশি মসজিদ সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই উপাসনালয়গুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটির বয়স ছিল পঞ্চাশ বছরেরও বেশি, যা এই অঞ্চলে তাদের দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের এক অকাট্য প্রমাণ বহন করে।

 

আবদুন নূর আরও জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের অনেককেই এই বনভূমিতে নিয়ে আসা হয়েছিল বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই বনের সাথে একাত্ম হয়ে বসবাস করছিলেন এবং বনের রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রেখেছিলেন।

 

নিজেদের আইনি অধিকার রক্ষায় তারা গৌহাটি হাইকোর্টেরও দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের বিচারব্যবস্থা থেকেও তারা কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক প্রতিকার বা স্থগিতাদেশ পাননি, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আজ তাদের এই অমানবিক বাস্তুচ্যুতির শিকার হতে হলো।

 

এই ঘটনার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু হয়েছে। গত জুন মাসেই ‘অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস’ নামের একটি বনকর্মীদের অধিকার রক্ষাকারী সংগঠন আসাম সরকারের কাছে লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গ্রামবাসীদের এই পরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল।

 

সংগঠনটি ঐতিহাসিক নথিপত্র উপস্থাপন করে যুক্তি দিয়েছিল যে, ওই এলাকার কন্দর্প লংজাপ, পদুমনি, হাতিজুর এবং ৯ নম্বর খেরোনি-এই চারটি গ্রামের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ‘টংগিয়া’ বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় সেখানে বসতি গড়ে দেওয়া হয়েছিল।

 

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা বনাঞ্চল সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই বিশেষ পদ্ধতি চালু করে, যা পরবর্তীতে আসামের বিভিন্ন এলাকাতেও প্রয়োগ করা হয়। এই টংগিয়া পদ্ধতির মূল শর্তই ছিল যে, বনাঞ্চলে বসবাসকারী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বন বিভাগের অধীনে শ্রমিক হিসেবে কাজ করবেন এবং বিনিময়ে তারা বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান গাছপালা রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নিজেদের জীবনধারণের জন্য সেখানে খাদ্যশস্যও চাষ করতে পারবেন।

 

সুতরাং, ঐতিহাসিকভাবেই তারা এই বনভূমির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের কোনোভাবেই সাধারণ বনভূমি দখলকারী বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে অধিকারকর্মীরা বার বার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসন এই ঐতিহাসিক চুক্তি ও মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করেই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করেছে।

 

সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি আসামের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি রাজ্যের একটি চলমান কাঠামোগত প্রক্রিয়ার অংশ। দ্য স্ক্রল-এর সংগৃহীত এবং রাজ্যের রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও জেলা প্রশাসনগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের গত দশ বছরের শাসনামলে সরকারি জমি বা বনভূমি পুনরুদ্ধারের নামে প্রায় উনিশ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

 

মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকদের মতে, উচ্ছেদ হওয়া এই বিপুল সংখ্যক পরিবারের একটি বিশাল অংশই হলো প্রান্তিক মুসলিম সম্প্রদায়। বছরের পর বছর ধরে আসামের এই বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী নাগরিকত্ব ও ভূমি অধিকার নিয়ে এক চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

 

একদিকে যেমন তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের এক অন্তহীন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়ে নিজ দেশেই তাদের পরিণত হতে হচ্ছে উদ্বাস্তুতে। কোনো কার্যকর বিকল্প পুনর্বাসন ব্যবস্থা ছাড়াই এমন ঢালাও উচ্ছেদ অভিযান মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সমাজতত্ত্ববিদরা।

 

শীতের ঠিক আগমুহূর্তে শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে এই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো কোথায় যাবে, কীভাবে তারা তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার নিশ্চিত করবে, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সরকারের কাছে নেই।

 

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিজস্ব নাগরিকদের প্রতি এমন বৈষম্যমূলক ও কঠোর নীতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী, যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আর্থসামাজিকভাবে আরও বেশি প্রান্তিক ও কোণঠাসা করে তুলছে।

 

- দ্য স্ক্রল