বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২২, ২০২৬
৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সীমান্তে আবারও বিশালাকার লাউডস্পিকার চালুর হুমকি পিয়ংইয়ংয়ের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম

সীমান্তে আবারও বিশালাকার লাউডস্পিকার চালুর হুমকি পিয়ংইয়ংয়ের
ছবি : Collected

কোরীয় উপদ্বীপে আবারও বাজতে চলেছে সংঘাতের দামামা, তবে এবার অস্ত্রের ঝনঝনানির পাশাপাশি শুরু হতে যাচ্ছে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপে রাখতে এবং সীমান্তে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে আবারও বিশালাকার লাউডস্পিকার বা মাইক চালুর কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া।

 

দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন এবং শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিম ইয়ো জং এই হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়া যদি তাদের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড এবং উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে, তবে সিউলকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে।

 

এই ঘোষণার ফলে দুই কোরিয়ার মধ্যকার বিরাজমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে কিম ইয়ো জং জানান যে, চলতি অক্টোবরের শেষ নাগাদ পুরো সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী এই বিশাল লাউডস্পিকারগুলো পুরোপুরি সক্রিয় করা হবে।

 

এর আগে বুধবার গভীর রাতে তিনি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে সীমান্তের সেনাদুর্গ এবং প্রতিরোধব্যবস্থাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। তার এই পরিদর্শনকে একটি সুস্পষ্ট সামরিক বার্তা হিসেবেই দেখছে সিউল।

 

কিম ইয়ো জংয়ের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলো ইতোমধ্যেই সীমান্তে তাদের নতুন এবং সুবিধাজনক অবস্থান গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক বার্তা প্রচার করছে এবং একাধিক স্থানে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।

 

তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার এই তথাকথিত সতর্কতামূলক গুলিতে যদি উত্তর কোরিয়ার সার্বভৌম ভূখণ্ড বা কোনো সেনাসদস্য সামান্যতম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে দক্ষিণ কোরীয় বাহিনীকে ‘বিনা দ্বিধায় ও নির্মমভাবে নির্মূল’ করা হবে।

 

উত্তর কোরিয়ার এই আগ্রাসী বিবৃতির পর দক্ষিণ কোরিয়াও নীরব থাকেনি। সিউল তাদের গৃহীত সামরিক পদক্ষেপগুলোকে সম্পূর্ণ ‘আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক’ বলে দাবি করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ও একীভূতকরণ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতির মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থেকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ কমান্ডের সার্বিক সহায়তায় অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদারে সিউল সম্প্রতি যে কার্যকর পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, মূলত তাতেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন কিম ইয়ো জং।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, উত্তর কোরিয়া যদি সত্যিই তাদের এই হুমকি বাস্তবায়ন করে এবং সীমান্তে লাউডস্পিকার চালু করে, তবে দক্ষিণ কোরিয়াও তার ‘সমানুপাতিক ও উপযুক্ত জবাব’ দিতে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না।

 

কিম ইয়ো জংয়ের এই সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি দুই কোরিয়ার মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা কমিয়ে আনার জন্য নানামুখী কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন।

 

কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা যে খুব একটা আলোর মুখ দেখেনি, এই ঘটনাই তার জ্বলন্ত প্রমাণ। গত বছরের জুনে তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী কোরীয় যুদ্ধ একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হওয়ার পর থেকেই এই ডিমিলিটারাইজড জোন বা ডিএমজেড দুই দেশকে পৃথক করে রেখেছে।

 

ঐতিহাসিকভাবেই এই দুই দেশ সীমান্তে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে শক্তিশালী লাউডস্পিকার ব্যবহার করে আসছে। অতীতে দক্ষিণ কোরিয়ার মাইকে জনপ্রিয় কে-পপ গান, বিশ্ব সংবাদ এবং উত্তর কোরিয়ার শাসকদের সমালোচনামূলক বার্তা প্রচার করা হতো, যা সবর্দাই পিয়ংইয়ংয়ের চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের কারণ ছিল।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং তার মেয়াদকালের শুরুতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ানোর একটি সদিচ্ছামূলক উদ্যোগ হিসেবে গত বছর সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচারণা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং স্পিকারগুলো সীমান্ত থেকে সরিয়ে ফেলেছিলেন।

 

তার এই ইতিবাচক পদক্ষেপের জবাবে উত্তর কোরিয়াও সেসময় তাদের নিজস্ব প্রচারণা বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু এই শান্ত পরিস্থিতি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পিয়ংইয়ং সিউলের সব ধরনের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকেই সীমান্তে স্থায়ী কংক্রিটের দেয়াল নির্মাণ, নতুন করে ল্যান্ডমাইন স্থাপন এবং কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার মতো সামরিক কাজগুলো পুরোদমে চালিয়ে যেতে থাকে।

 

ফলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার বদলে তা আরও বেশি জমাট বাঁধতে শুরু করে। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এই উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়।

 

সিউল সরাসরি এই ঘটনার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করে বিবৃতি দেয়। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই পিয়ংইয়ং এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে এবং পুরো ঘটনাটিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘বানানো গল্প’ বলে উড়িয়ে দেয়। এই ধরনের পালটাপালটি অভিযোগের কারণেই মূলত বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সিউলের কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক লিম উল-চুল গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, কিম ইয়ো জংয়ের এই হুমকির অর্থ এই নয় যে লাউডস্পিকারগুলো আগামীকালই চালু হয়ে যাবে। উত্তর কোরিয়া মূলত মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে।

 

তবে এই হুমকি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের প্রশাসনের সামনে একটি বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বিধা বা ডিলিমার জন্ম দিয়েছে। একদিকে তাকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর মনোবল অটুট রাখতে হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে হবে।

 

এই দ্বিমুখী চাপে সিউল আগামী দিনগুলোতে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে কোরীয় উপদ্বীপের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা। কোরীয় উপদ্বীপের এই চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের পেছনে রয়েছে স্নায়ুযুদ্ধের এক দীর্ঘ ইতিহাস, যা আজও এই অঞ্চলের মানুষকে শান্তিতে বসবাস করতে দিচ্ছে না।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, লাউডস্পিকারের মাধ্যমে চালানো এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার হাতিয়ার নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

 

উত্তর কোরিয়া যখন তাদের মাইকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও কিম পরিবারের বন্দনা প্রচার করে, তখন তার মূল লক্ষ্য থাকে দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করা। বিপরীতে, দক্ষিণ কোরিয়ার কে-পপ বা গণতান্ত্রিক বার্তাগুলো উত্তর কোরিয়ার কঠোর সেন্সরশিপে থাকা নাগরিকদের মনে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, যা পিয়ংইয়ংয়ের শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি সরাসরি হুমকি।

 

তাই লাউডস্পিকারের এই লড়াই কেবল শব্দের নয়, এটি আদর্শ ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক নিরন্তর সংগ্রাম। বর্তমানে সারা বিশ্ব যখন অর্থনৈতিক সংকট ও অন্যান্য আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বার বার উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানালেও, বাস্তব পরিস্থিতিতে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। বরং, দুই পক্ষই নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং উসকানিমূলক বাগাড়ম্বরের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও খাদের কিনারায় নিয়ে যাচ্ছে।

 

আগামী দিনগুলোতে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি আলোচনার টেবিলে বসে একটি টেকসই সমাধানের পথ খুঁজে না বের করতে পারে, তবে এই লাউডস্পিকারের শব্দ অচিরেই অস্ত্রের গর্জনে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

 

- দ্যা গার্ডিয়ান